ম. ম. রবি ডাকুয়া, মোংলা : মোংলা বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হচ্ছে আজ ৫ নভেম্বর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দরের পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মোংলা বন্দরের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হবে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী আজ সকাল ১০টায় মোংলা বন্দরে পৌঁছাবেন। এ সময় তিনি নতুন দুটি কনটেইনার জেটি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমন ও প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকে ঘিরে বন্দর এলাকায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ৪৭৫ কোটি টাকা এবং চীনের অর্থায়ন থাকবে ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এ প্রকল্পের ঋণ ও অর্থায়নসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক দুটি কনটেইনার জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড এবং বিপজ্জনক পণ্য ওঠানামার জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে যুক্ত করা হবে ৪৯টি আধুনিক যন্ত্রপাতি। নতুন ইয়ার্ডে ঘণ্টায় ৩০টির বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার সক্ষমতা তৈরি হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বেড়ে চার লাখ টিইইউতে উন্নীত হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। নতুন কনটেইনার ইয়ার্ডে পূর্ণ কনটেইনার সংরক্ষণ, খালি কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য নিরাপদে ওঠানো-নামানোর জন্য পৃথক সুবিধা থাকবে। ফলে বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, কনটেইনার সংরক্ষণ এবং পরিবহনের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সুশৃঙ্খল হবে। বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের ওপর দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়বে। বর্তমানে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। নতুন অবকাঠামো যুক্ত হলে মোংলা বন্দরকে বিকল্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে আরও কার্যকরভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য পণ্য পরিবহনের বিকল্প সুযোগ তৈরি হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণে উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর সফরে মোংলা বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হওয়ার কথা রয়েছে। এদিন প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ও চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে কনটেইনার পরিবহনে রেলপথের ব্যবহার বাড়বে। দেশের বিভিন্ন স্থানের অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো থেকে সরাসরি রেলপথে পণ্য বন্দরে আনা এবং সেখান থেকে বিদেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় কমার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের জন্য বন্দর ব্যবহার আরও সহজ হবে। নাব্যতা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি তবে শুধু নতুন জেটি ও ইয়ার্ড নির্মাণ করলেই বন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। তাঁদের মতে, মোংলা বন্দরের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ পশুর চ্যানেলের নাব্যতা রক্ষা। এ জন্য নিয়মিত ও পরিকল্পিত ড্রেজিং এবং খনন করা চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখা জরুরি। মোংলা বন্দর বার্থ শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকার আলী বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পশুর চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিং, মোংলা-খুলনা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা, রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর করা, ফয়লা বিমানবন্দর চালু এবং বন্দরের আকরাম পয়েন্টে দ্রুত এলএনজি স্টেশন নির্মাণ। বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, এসব অবকাঠামো উন্নয়ন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে মোংলা বন্দরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা মোংলা বন্দরকে ঘিরে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বন্দরের সক্ষমতা বাড়লে আমদানি করা কাঁচামাল দ্রুত শিল্পাঞ্চলে পৌঁছানো এবং উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, রামপাল শিল্পাঞ্চল এবং আশপাশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে উন্নত বন্দর অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন, পণ্য খালাস, গুদামজাতকরণ, জাহাজ পরিচালনা, শ্রম ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) আসনের সংসদ সদস্য লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, নতুন জেটি নির্মাণের পাশাপাশি রেল যোগাযোগের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলে মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে। এতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ ও বিনিয়োগ বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও মোংলায় প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্বিতীয়বারের মতো মোংলা বন্দর সফরকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী, বন্দর ব্যবহারকারী ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এর আগে গত ২২ অক্টোবর তিনি মোংলা বন্দর, দাকোপ ও সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করেন। ওই সফরে বন্দরের উন্নয়ন সম্ভাবনা, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেন। আজ ৫ নভেম্বরের সফরে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও রেল যোগাযোগসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর প্রধানমন্ত্রী বাগেরহাটে হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। পরে তিনি খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ দ্বিতীয় মৌসুমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সব মিলিয়ে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার এ প্রকল্প মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে যাচ্ছে। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা, পশুর চ্যানেলের নাব্যতা বজায় রাখা, সড়ক-রেল যোগাযোগ উন্নত করা এবং বন্দরের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের ওপর। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয়, দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।