আবদুল কাদের : শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজার উপকরণসহ নিজেদের সাজসজ্জার জিনিসপত্র কিনতে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বাজার ঘুরছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা; বৈশ্বিক মন্দার কারণে দামে ঊর্ধ্বগতিতে শখের সঙ্গে সাধ্যের সমন্বয় করছেন সীমিত আয়ের অনেকেই। বিক্রেতারাও বলছেন, বৈশ্বিক সংকটে অর্থনৈতিক অবস্থা স্তিতিশীল না হবার কারণে ‘হিসাব কষে’ কেনাকাটা সারছেন ক্রেতারা। ফলে বেচাকেনা নিজেদের প্রত্যাশার সঙ্গে ‘সন্তোষজনক’ হয়ে ওঠেনি। তবে ছিটকাপড়ের দোকানের ব্যবসা ভালো হয়েছে। যশোর শহরের বড় বাজার, কালেক্টরেট মার্কেট, মুজিব সড়ককের দোকানগগুলোতে শাঁখা, সিঁদুর, নতুন পোশাক এবং পূজার নানা উপকরণ কিনতে গত কিছুদিন ধরেই ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। রোববার অষ্টমিতেও সেরেছেন শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা। প্রায় সব দোকান সাজানো হয়েছে পূজার যাবতীয় সরঞ্জাম, শাঁখা, সিঁদুর ও দেবীর অলঙ্কারে। এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরে ঘুরে নিজের পছন্দের জিনিসপত্র দরদাম করে কিনছেন ক্রেতারা। অনেকে সপ্তমীর পূজা শেষ করেও এসেছেন বাকি কেনাকাটা সারতে। গতকাল শহরের বেজপাড়ার বাসিন্দা রুমা সরকার সোনাপট্রিতে আসেন কেনাকাটা করতে। তিনি বলেন, সকালে মণ্ডপে পূজা আর অঞ্জলি শেষ করেই বাজারে ছুটে এসেছি। পূজার বাকি দিনগুলোতে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসা থাকবে, তাই শেষ মুহূর্তের কিছু প্রসাধনী আর গহনা বাকি ছিল, সেটার কেনাকাটা এখন সেরে নিচ্ছি। অঞ্জলি দিয়ে আসার পর কেনাকাটার আনন্দটাও অন্যরকম লাগে। তার মতে ইচ্ছা ছিল সন্তানদেরকে সোনার গহনা উপহার দেব। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। কেননা সোনার গহনার যে দাম তা কেনা সম্ভব হচ্ছেনা। তবে কিছু রুপা আর ইমিট্রেশন গহনা কিনেছি। রোববার গ্রামের বাড়ি বাঘারপাড়া উপজেলার নারকেলবাড়িয়ায় ফেরার আগে কাপুড়িয়া পট্রিতে আসেন বেসরকারি চাকরিজীবি শুভংকর বিশ্বাস। নিজের স্ত্রী-সন্তানসহ মা ও দাদির জন্য বিভিন্ন দোকান ঘুরে শাড়ি ও অন্যান্য পোশাক কেনেন তিনি। তিনি বলেন, “পাঁচ দিনের ছুটি পেয়েছি, বাড়ি যাচ্ছি। বেতনটা পেয়েই কেনাকাটা করতে এসেছি। স্বার্ধের মধ্যে যতটুকু কেনা যায় আরকি। পূজার সময়ে খালি হাতে বাড়ি যাওয়া যায় না। তাই কিনতে এলাম কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই দুর্গাপূজার উপকরণ আর পোশাক-অলঙ্কারসহ সাজসজ্জার জিনিসপত্র বিক্রি বেশি হলেও শেষ মুহূর্তে ক্রেতার আশায় রয়েছেন বিক্রেতাদের অনেকেই। যদিও এবারের বিক্রি নিয়ে ‘হতাশার’ কথাও বলছেন তারা। মুজিব সড়ক দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও তাড়ং পোশাকের মালিক হাদিউর জামান বাপ্পি বলেন, “উৎসবের আমেজ স্পষ্ট হলেও মানুষের মনে কিছুটা টানাপড়েন ও উদ্বেগ রয়ে গেছে। প্রতি বছর পূজায় বিক্রির যে একটা বড় লক্ষ্যমাত্রা থাকে, এবার সেটি পূরণ হয়নি। দেশে স্থিতিশীল অর্থনীতি নেই। তার ওপর রয়েছে বৈশ্বিক সংকট। খাদ্যমূল্যের উর্ধ্বদামে মানুষ যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু কিনছেন। এতে করে আশানারুপ বিক্রি হচ্ছেনা। একই সড়কে অবস্থিত সেইলরের শাখা ব্যবস্থাপক আরিফ হোসেন জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় বিক্রি মোটামুটি ভালো। আমাদের কার্ডধারীদের জন্য ২০ শতাংশ এবং পাঞ্জাবি, শার্ট, জুতা ও ব্যাগে ৩০ শতাংশ মূল্যছাড় দেয়া হচ্ছে। সব ব্যান্ড কোম্পানির শো-রুমে মূল্যছাড় দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। ইনফিনিটি শোরুমের শাখা ব্যবস্থাপক আশিকুর রহমান জানান, বৈশ্বিকভাবে অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নেই, তারপরও মোটামুটি বিক্রি হচ্ছে আমাদের। ক্রেতাদের জন্য মূল্যছাড় চলছে আমাদের। যশোর বড় বাজারের ছিট কাপড় দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও এইচএম ক্লথস্টোরের মালিক রাফিউল আলম বাবু জানান, আমাদের এখানে ৪০টি দোকান রয়েছে। ছিটকাপড়রের ব্যবসা ভালো হয়েছে। গত এক মাস আগে থেকে আমাদের বিক্রি শুরু হয়েছে। সোনাপট্রির গিনি এক্সচেঞ্জ দোকানের স্বত্বাধিকারী সাব্বির হোসেন বলেন, “সোনার দাম অতিরিক্ত হওয়ায় মানুষ শৌখিন গয়নার বদলে কেবল বাধ্যতামূলক পূজার নিয়ম রক্ষায় ব্যবহৃত জিনিসগুলোই বেশি কিনছেন।” এমনকি বিয়ের জন্য গহনা বিক্রি তেমন হচ্ছেনা। যারা এক ভরি কিনত, তারা চারআনায় নেমে এসেছেন। যাদের বিয়েতে ৫ ভরি কেনার সামার্থ ছিল, তারা এক বা দুই ভরি কিনছেন। কোন রকম টিকে আছি আমরা। পূজা ও ঈদে আমাদের বিক্রি বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু বৈশ্বিক সংকট আর অর্থনীতি স্থিতিবস্থা না হওয়ায় সোনা বিক্রি হচ্ছেনা। মনসা বস্ত্রালয়ের মালিক চিন্ময় সাহা বলেন, “শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজই সবচেয়ে বেশি চলছে। এর মধ্যে কাতান, সিল্ক, এমব্রয়ডারি ও জামদানি শাড়ির চাহিদা বেশি। বড় বাজারে কেনাকাটা সারতে আসা সুবর্ণা দাশ বলেন, তিনি ৫টি জামদানি শাড়ি কিনেছেন সাড়ে ৪ হাজার টাকা করে। তার হিসাবে গত বছরের চেয়ে প্রতিটি শাড়িতে অন্তত ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি পড়েছে। একইসঙ্গে বাচ্চাদের পোশাক ও জুতার দামও বেশি মনে হয়েছে তার কাছে। তার কথায়, “আমাদের বাজেট কমেছে, কিন্তু বাজারভর্তি দামি জিনিস। পূজা বলে কথা, না কিনে তো উপায় নেই। বাজারে একটা শাড়ির যে বাজেট নিয়ে এসেছিলাম, তাতে পছন্দসই জিনিস পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচেই নিতে হয়েছে। নীলগঞ্জ এলকার স্বপ্না কর্মকর নামে আরেক ক্রেতা বলেন, “এবারের কালেকশন ভালো, কিন্তু দামটা অনেক বেশি মনে হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে যে শাড়ি ৫ হাজার টাকা দেখে গেলাম, সেটা আজকে ৮ হাজার টাকা চাচ্ছে। দাম সবকিছুর চড়া। শহরের ষষ্ঠিতলার আদিবাসী রমা সরকার বলেন, আমরা হতদরিদ্র। ইটের খোয়া ভেঙ্গে সংসার চালাতে হয়। ঠিকমত কেতে পায়না। সেখানে আমাদে রমতো মানুষদের পূজা পালন কঠিন হয়ে উঠে। মানুষের সহায়তা পেলে কাপড় কেনাকাটা করতে পারি। না হলে আমরা নতুন কাপড় কিনিনা। এত দাম দিয়ে কাপড় কেনা কষ্টকর ব্যাপার। পূজা ঘিরে এবার ইমিটেশন গয়নার দোকানে চুড়ি, হার ও আংটি বিক্রি বেশি হওয়ার কথা বললেন সোনাপট্রির স্বর্ণময়ী সিটিগোল্ড দোকানের মালিক সঞ্জয় দাস। তার কথায়, “পূজা ঘিরে চুরি ও গয়না বিক্রি ভালো হয়েছে। চলতি বছরের গত কয়েক মাসের তুলনায় এই মাসে আমরা বেশ ভালো ক্রেতা পেয়েছি। বিশেষ করে সোনার দাম অনেক বেশি হওয়ায় মানুষ সিটিগোল্ডের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।