ফরহাদ খান, নড়াইল : শুক্রবার ষষ্ঠী পূজার মধ্যদিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। হিন্দু অধ্যুষিত নড়াইলে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই জেলায় রয়েছে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে অন্তত ১৫টি এলাকায় গা ঘেষে মসজিদ-মন্দিরের অবস্থান সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে জেলা শহরের মহিষখোলা এলাকায় মসজিদ-মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান। এখানে সম্প্রীতির বন্ধনে প্রায় ৪৫ বছর ধরে চলছে দুই ধর্মের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে নেই কোনো হিংসা, বিদ্বেষ। বরং যুগ যুগ ধরে ধর্ম পালনে একে-অপরকে সহযোগিতা করে আসছেন সবাই। জেলা শহরের মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামণ্ডপের সহসভাপতি প্রলয় কুমার ভৌমিক বলেন, মহিষখোলায় একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান। এটি সারাদেশের মধ্যে অনন্য নজির। এই নিয়ে দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে কখনো মতবিরোধ নেই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে যার যার ধর্ম পালন করছেন। নামাজ ছাড়াও মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন একই মাঠ ব্যবহার করে ওয়াজ মাহফিল দিচ্ছেন। আবার আমরা পূজার কাজে মাঠ ব্যবহার করছি। একেবারে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান। মসজিদের ইমাম হাফেজ মো : এনামুল হক জানান, মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামণ্ডপ এবং পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদটি একই জায়গায়। আমাদের নামাজের সময় ওরা পূজা অনুষ্ঠান বন্ধ রাখে। নামাজ শেষ হলে আমার তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু করে। এখনো পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। আশা করছি ভবিষ্যতেও সমস্যা হবে না। মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামণ্ডপের সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর বলেন, দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আমাদের পূজামণ্ডপ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মসজিদটি পাশাপাশি অবস্থান করছে। যে যার ধর্ম পালন করছেন। আজানের সময় আজান হচ্ছে। আবার পূজার অনুষ্ঠান হচ্ছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আমরা একে-অপরকে সহযোগিতা করে আসছি। মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ধর্মীয় বিধি-বিধান সুষ্ঠু-সুন্দর ভাবে পালন করে আসছেন। পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মফিজুর রহমান বলেন, আল কোরআনে সূরা কা-ফিরুন এ আল্লাহপাক বলেছেন, লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন। অর্থাৎ ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের এবং আমার ধর্ম আমার (কাছে প্রিয়)’। মুয়াজ্জিন মফিজুর রহমান আরও বলেন, যে দেশে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে দেশে অন্যন্যা ধর্মালম্বীরা মুসলিমদের কাছে আমানত। ডিমের ভেতরে কুসুম যেমন নিরাপদ, তেমনি তারা (অমুসলিম) নিরাপদে থাকবে। আমরা সেইভাবে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করি। শহরের ভওয়াখালী মিতালী সংঘের পূজারী তন্দ্রা মুখার্জি বলেন, আমাদের নড়াইলে দুর্দান্ত একটি উদাহরণ হলো-মহিষখোলা ছাড়াও জেলার অনেক স্থানে মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান। এখানে মুসলিম এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। আমরা ছোটবেলা থেকে এভাবেই দেখে আসছি। এদিকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহিষখোলা এলাকা ছাড়াও অন্তত ১৫টি স্থানে মসজিদ ও পূজামণ্ডপের একেবারে কাছাকাছি অবস্থান রয়েছে। নামাজের সময় হলে পূজামণ্ডপের ঢাক-ঢোল, গান-বাজনাসহ বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান যেমন বন্ধ থাকছে; তেমনি পূজা-অর্চনার সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবের সুযোগ করে দিচ্ছেন। সঙ্গতকারণে নড়াইলে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট পজঙ্ক বিহারী অন্ন ষোষ জানান, এ বছর নড়াইলে ৫৪৩টি মণ্ডপে সুষ্ঠু-সুন্দর ভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু বলেন, আমি শহরের যে (মহিষখোলা) ওয়ার্ডের বাসিন্দা, সেইখানে আমার বাড়ির পাশেই মসজিদ ও মন্দির মুখোমুখি। এখানে একই মাঠ ব্যবহার করে দুই ধর্মের লোকজন যার যার ধর্ম পালন করছেন। আশার করছি এবারও সবকিছু স্বাভাবিক থাকবে। বিগত সময়ে আমাদের এখানে কোনো সমস্যা হয়নি। দুর্গাপূজা সুষ্ঠু-সুন্দর ভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নড়াইলে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। যাতে কেউ ঘোলাপানিতে কেউ মাছ শিকার করতে না পারেন।