বিল্লাল হোসেন : নতুন ঘর। নতুন স্বপ্ন। সেই ঘরটিকে মনের মতো করে সাজাতে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছিলেন দুবাই প্রবাসী আব্দুর রশিদ (৩৬)। উদ্দেশ্য ছিল নতুন বাড়ির জন্য টাইলস কেনা। তিন মাসের ছুটিতে দেশে এসে নির্মাণাধীন বাড়িটি ঘিরে কতই না স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু টাইলস আর কেনা হলো না। নতুন ঘরে আর ওঠাও হলো না। সড়কেই থেমে গেল স্বামী-স্ত্রীর জীবন। বাবা-মাকে হারিয়ে এখন মেয়ে শিল্পী খাতুন (১৪) ও ছেলে শাকিল হোসেন (৭) অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল। রোববার (৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে যশোর ক্যান্টনমেন্টের প্রধান ফটকের সামনে ইজিবাইকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন আব্দুর রশিদ ও তার স্ত্রী সাবিরা খাতুন। তাদের হাসপাতালে নেয়া হলেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নিভে যায় দু’জনের জীবনপ্রদীপ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাবিরা খাতুন। আর স্ত্রীকে হারানোর শোক বুকে নিয়েই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন রশিদ। উন্নত চিকিৎসার আশায় তাকে ঢাকার উদ্দেশে নেয়া হচ্ছিল। কিন্তু সেই পথও শেষ হলো না। ফরিদপুরের ভাঙ্গা এলাকায় পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় তার জীবন। একসঙ্গে পথচলা স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। নিহত আব্দুর রশিদ যশোরের চৌগাছা উপজেলার মাধবপুর গ্রামের মৃত ইসমাইলের ছোট ছেলে। তিনি দুবাই প্রবাসী ছিলেন। কয়েকদিন আগে তিন মাসের ছুটি নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন। চৌগাছা পৌর এলাকায় চলছিল তাদের নতুন বাড়ির নির্মাণকাজ। সেই বাড়ির জন্য টাইলস কিনতেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যশোর শহরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস-যে নতুন ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে টাইলস কিনতে বের হয়েছিলেন, সেই ঘরেই আর কোনোদিন ফিরতে পারলেন না তারা। হাসপাতালে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য মনির হোসেন জানান, আব্দুর রশিদ স্ত্রী সাবিরাকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে যশোর শহরের দিকে যাচ্ছিলেন। ক্যান্টনমেন্টের প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ইজিবাইকের সঙ্গে মোটরসাইকেলটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে স্বামী-স্ত্রী দুজনই গুরুতর আহত হন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাবিরা খাতুন মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যুর পর গুরুতর আহত রশিদকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। স্বজনরা তাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু প্রিয় মানুষটিকে হারানোর পর তাকেও আর বাঁচানো গেল না। ফরিদপুরের ভাঙ্গা এলাকায় পৌঁছালে মারা যান আব্দুর রশিদ। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. বিচিত্র মল্লিক জানান, হাসপাতালে ভর্তির সময় ওই দম্পতির অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। তাদের মাথা ও বুকে গুরুতর আঘাত ছিল। নিহত রশিদের বড় ভাই লোকমান হোসেন বলেন, ভাই কয়েকদিন আগে তিন মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিল। নতুন বাড়ির কাজ চলছিল। বাড়ির জন্য টাইলস কিনতে স্ত্রীকে নিয়ে যশোরে যাচ্ছিল। কত স্বপ্ন ছিল বাড়িটা নিয়ে। কিন্তু একটা দুর্ঘটনা সব শেষ করে দিল। রশিদের ভাইপো মুন্না হোসেন বলেন, চাচার আশা ছিল নতুন বাড়ির কাজ শেষ করে আবার বিদেশে চলে যাবেন। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হলো না। চাচার সঙ্গে চাচিও চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রোববার মাগরিবের নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় আব্দুর রশিদ ও সাবিরা খাতুনকে। যে মানুষ দুটি সকালে একসঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন, সন্ধ্যার পর তাদের ঠিকানা হলো পাশাপাশি দুটি কবর। তবে সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি এখন তাদের দুই সন্তান মেয়ে শিল্পী খাতুন (১৪) ও ছেলে শাকিল হোসেন (৭)। শিল্পী চৌগাছা বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। আর শাকিল স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে যে দুই শিশু স্বাভাবিক জীবনের কথা ভেবেছিল, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের পৃথিবীটাই যেন বদলে গেছে। মা-বাবাকে একসঙ্গে হারিয়ে পাগলপ্রায় শিল্পী ও শাকিল। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দিলেও থামছে না তাদের কান্না। নিহতের স্বজনরা জানান, একটি দুর্ঘটনা শুধু কেড়ে নেয়নি দুটি প্রাণ, ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, কেড়ে নিয়েছে দুই সন্তানের মাথার ওপর থেকে বাবা-মায়ের ছায়া। নতুন বাড়ির কাজ হয়তো একদিন শেষ হবে। ঘরে হয়তো টাইলসও বসবে। কিন্তু সেই ঘরে আর কোনোদিন ফিরবেন না আব্দুর রশিদ ও সাবিরা খাতুন। তাদের দুই সন্তান শুধু তাকিয়ে থাকবে যে ঘরটি তাদের বাবা-মায়ের স্বপ্নে তৈরি হচ্ছিল, সেই ঘরের প্রতিটি কোণে খুঁজবে হারিয়ে যাওয়া আপনজনদের। যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল মামুন জানান, যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাবিরা খাতুন মারা যান। তার স্বামী আব্দুর রশিদকে ঢাকায় নেওয়ার পথে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় পৌঁছালে তিনিও মারা যান। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় বিনা ময়নাতদন্তে লাশ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।