নিজস্ব প্রতিবেদক : বুধবার সকাল ৯টা, তখনো শুরু হয়নি প্রতিযোগিতা। যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকদের ভিড়। মাঠের পৃথক পৃথক স্থানে জটলা পাকিয়ে শিক্ষার্থীদের কেউ ঘড়িতে সময় দেখছে, কেউ ছোট চিরকুটের পাতা ওলটাচ্ছেন। কেউবা মাঝে মধ্য চিরকুটের দিকে চোখ বুলিয়ে তাতে লেখা লাইনগুলো গুনগুনিয়ে পড়ছেন। মনে হচ্ছে পরীক্ষা যুদ্ধে যাওয়ার আগে নিজেদের মতো করে গুছিয়ে নিচ্ছে প্রস্তুতি। তবে সবার চোখেমুখে আনন্দের ছাপ। সঙ্গে তুমুল উত্তেজনা। উদ্দেশ্য-যুক্তিতর্কে মেধা যাচাই। নিয়ম মেনে বিতর্ক প্রতিযোগিতা শুরু হলো সকাল ১০ টায়। শিক্ষার্থীরা নামল যুক্তি জয়ের যুদ্ধে। তুমুল উত্তেজনায় প্রতিযোগিতায় শুরু হওয়া এই যুদ্ধ চলে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত। স্কুলটির দুটি কক্ষতে শিক্ষার্থীরা এতটাই বিতর্কের যুক্তিতর্কে মুখর করে তোলেন; কখন যে সকাল গড়িয়ে দুপুর নামে বুঝতে পারেনি উপস্থিত অভিভাবক দর্শকেরা। ‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, বিজ্ঞানে মুক্তি’—এমন প্রত্যয়ে ১২তম জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের আয়োজন করেন বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ) ও দৈনিক সমকাল। জেলা পর্যায়ের স্বনামধন্য আটটি প্রতিষ্ঠান এই বির্তকে অংশ নেয়। পুরো সময় পাল্টাপাল্টি যুক্তি, তথ্য-উপাত্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত বক্তব্যে জমে উঠে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই বিতর্কের আসর। বিতর্ক উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন যশোর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ পরিচালক ও যশোর পৌরসভার প্রশাসক পসভ: রফিকুল হাসান। এসময় তিনি বলেন, ‘বিতর্ক মানুষের ব্যক্তিত্বকে আলোকিত ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন করে। যদি তা না-ও পারে, অন্তত উপলব্ধি করতে শেখায়, সে নিজে আলোকিত কিনা। বিতর্ক কোনো বিষয়কেও আবার গভীরভাবে অনুসন্ধানের চেষ্টা করে। তাই তিনি বিতর্কের মাধ্যমে পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা অব্যাহত রেখে মানবতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান শিক্ষার্থীদের। এ সময় তিনি সমকালকে ধন্যবাদ জানান এই ধরণের আয়োজন করার জন্য। সমকাল সুহৃদ সমাবেশ যশোর শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরুর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনেয়ারা পারভীন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুন অর রশিদ ও যশোর চেম্বার অব কর্মাসের যুগ্ম সম্পাদক এজাজ উদ্দিন টিপু। স্বাগত বক্তব্য রাখেন দৈনিক সমকালের যশোর অফিসের সিনিয়র রিপোর্টার এস এম তৌহিদুর রহমান। দিনব্যাপি প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত পর্বে যশোর জিলা স্কুলকে হারিয়ে যশোর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন হয়। যশোর জিলা স্কুলের সাফওয়ান শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হন। প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুন অর রশিদ, ধ্রুব নিউজের সম্পাদক হাবিবুর রহমান রিপন, উদীচী যশোরের সহ-সাধারণ সম্পাদক আসিফ আকবর নিপপন। বির্তক প্রতিযোগিতার পরিচালনা করেন মাইকেল মধুসূদন ডিবেট ফেডারেশন (এমএমডিএফ) চেয়ারম্যান বায়জিত মাহমুদ অভি। সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিবৃন্দরা। উৎসবে যশোর জিলা স্কুল, যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, যশোর কালেক্টরেট স্কুল, যশোর এমএসটিপি স্কুল এন্ড কলেজ, যশোর সরকারি শিক্ষাবোর্ড মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, যশোর ইসলামিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, বিএএফ শাহিন স্কুল এন্ড কলেজ ও সেক্রেড হার্ট মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের মোট ২৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। # শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উচ্ছ্বাস যশোর জিলা স্কুল থেকে বির্তক উৎসবে অংশ নেয় শুভ্র ঘোষ। অনুষ্ঠান শুরুর আগে সহযোগী অন্য প্রতিযোগীর সঙ্গে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এসময় তিনি বলেন, ‘এ প্রতিযোগিতার কথা ভেবে গতকাল রাত থেকে আমার চোখে ঘুম নাই। শুধু মনে হচ্ছিল কখন আসব, প্রতিযোগিতা কেমন হবে ইত্যাদি। শুরুতে একটু নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু এখানে এসে সবাইকে দেখে খুব ভালো লাগছে।’ শিক্ষার্থী বা শিক্ষকদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে আসেন অভিভাবকেরাও। প্রতিযোগিতা নিয়ে তারাও ছিলেন উচ্ছ্বসিত। আব্দুল কাদের নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘যশোরে একসময় বির্তক উৎসব হতো। দীর্ঘদিন বন্ধ ছিলো। তবে সমকালের এই নতুন মাত্রা পেয়েছে। আয়োজনের জন্য সমকাল কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানায়। কেননা বির্তকের মাধ্যমে একজন বিতার্কিক আলোকিত ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসাবে গড়ে উঠে।’