মিরাজুল কবীর টিটো : সামনে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি, তাতে বসে প্রিয় শিক্ষক। চারপাশে শিক্ষার্থীরা। কারও চোখে আনন্দ, কারও চোখেমুখে বিদায়ের বিষণ্নতা। বিদ্যালয়ের চেনা আঙিনা পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। এটি কোনো রাজকীয় শোভাযাত্রা নয়, তবু দৃশ্যটি যেন রাজকীয়। কারণ, এই শোভাযাত্রার রাজা একজন শিক্ষক, আর তাঁর রাজত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের শেষে প্রিয় শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলমকে এমনই ব্যতিক্রমী ভালোবাসায় বিদায় জানালেন যশোর মুসলিম একাডেমীর শিক্ষক, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার দুপুরে যশোর মুসলিম একাডেমীর হলরুমে শুরু হয় জাহাঙ্গীর আলমের বিদায় সংবর্ধনা। শিক্ষক, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল স্মৃতিচারণ, শ্রদ্ধা আর আবেগের আবহ। আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে সেখানে বড় হয়ে উঠেছিল একজন শিক্ষককে ঘিরে বহু বছরের সম্পর্কের গল্প। প্রধান শিক্ষক পল্লব কান্তি ঘোষের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সহকারী প্রধান শিক্ষক তপন তরফদার, সহকারী শিক্ষক এইচ এম ইকবাল, তৈয়েবা খাতুন, শিক্ষক প্রতিনিধি জিল্লুর রহমান, সহকারী শিক্ষক সালমা আক্তার এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী মরিয়ম খাতুন, আবু বক্কর, নওশীন আফিয়া, জাহিদ হাসান টগর, মিনহাজুর রহমান, দেবাংশু, ইমরান নূর প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সহকারী শিক্ষক রাজু আহমেদ। বিদায়ী বক্তব্যে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শিক্ষক বেঁচে থাকেন তাঁর শিক্ষার্থীদের মাঝে। মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলাই একজন শিক্ষকের সার্থকতা। কোনো শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করলে যেমন শিক্ষক আনন্দিত হন, তেমনি খারাপ ফলাফল করলে কষ্টও পান। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠেও তখন বিদায়ের অনুভূতি। তিনি বলেন, এই বিদায় তাঁর জীবনের সার্থকতা। এটি তাঁর জন্য সর্বোচ্চ সম্মান। রাজকীয় এই বিদায় আজীবন মনে থাকবে। প্রধান শিক্ষক পল্লব কান্তি ঘোষ বলেন, একজন শিক্ষককে এভাবে ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানানো সত্যিই গর্বের বিষয়। আলোচনা শেষে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিদায়ী শিক্ষককে বিভিন্ন উপহার দেওয়া হয়। এরপর আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে জাহাঙ্গীর আলমকে বসিয়ে তাঁকে নিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের হন শিক্ষার্থীরা। ঘোড়ার গাড়ি এগিয়ে চলে ধর্মতলা কদমলার দিকে। পাশে হাঁটতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। কেউ স্মৃতি ধরে রাখছেন ছবি তুলে, কেউবা প্রিয় শিক্ষককে ঘিরে শেষবারের মতো সময়টুকু উপভোগ করছেন। বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে পথচারীদের নজরও আটকে যায় এই ব্যতিক্রমী বিদায়যাত্রায়। অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখেন দৃশ্যটি। এই যাত্রা যেন শুধু একজন অবসর নেওয়া শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। ছিল একজন শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের ঋণ স্বীকারের প্রতীকী প্রকাশ। যে মানুষটি বছরের পর বছর শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠ দিয়েছেন, ভুল শুধরে দিয়েছেন, ভালো ফলাফলে আনন্দ পেয়েছেন আর ব্যর্থতায় কষ্ট পেয়েছেন-বিদায়ের দিনে তাঁকেই শিক্ষার্থীরা ফিরিয়ে দিলেন ভালোবাসার এক রাজকীয় সম্মান। জাহাঙ্গীর আলম ২০০০ সালের ১১ মে যশোর মুসলিম একাডেমীতে যোগ দেন। এর আগে তিনি ইস্পাহানি গ্রুপে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ ২৬ বছরের বেশি সময় শিক্ষকতা শেষে ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই তিনি অবসরে যান। অবসর মানে কর্মজীবনের সমাপ্তি। কিন্তু একজন শিক্ষকের গল্প সেখানে শেষ হয় না। তাঁর শেখানো কথা, শাসন, স্নেহ আর স্মৃতিগুলো ছড়িয়ে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে। জাহাঙ্গীর আলমের ঘোড়ার গাড়িতে সেই বিদায় যেন তারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি একজন শিক্ষক বিদ্যালয় থেকে ফিরেছেন নিজের ঘরে, কিন্তু তার জায়গা রয়ে গেছে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে।