নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলের মানসিক রোগগ্রস্ত মেয়ের সাথে মাদ্রাসা শিশু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বাকবিতন্ডার জেরে এমপির বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার সকালে একদল নারীকে উসকে দিয়ে একটি পক্ষ ইট পাটকেল ছুড়ে এমপির তিনতলা বাড়ির বেশ কয়েকটি জানালার কাচের গ্লাস ভেঙে ফেলে। মুল গেটে ইট দিয়ে ও পা দিয়ে লাথি মেরে আঘাত করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে মাদ্রাসার নারী অভিভাবকরা। এঘটনায় দিনভর অবরুদ্ধ ছিলেন এমপি অধ্যাপক গোলাম রসুল ও তার পরিবার। অবশ্য মানসিক রোগগ্রস্ত মেয়ের আচরণে দুঃখ প্রকাশ করে ফেসবুকে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন এমপি অধ্যাপক গোলাম রসুল। বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। তিনি উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন এবং আজ বুধবার বিষয়টি নিরসনের জন্য উভয় পক্ষকে নিয়ে বসবেন জানা গেছে। এসময় জেলা জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি গোলাম কুদ্দুস, নগর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম মুল্লুক চাঁদসহ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বিকেলে অবরোধ তুলে নিলে পরিস্থিত স্বাভাবিক হয়। যশোর শহরের নীলগঞ্জ সুপারি বাগান এলাকার প্রফেসর পাড়ায় যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুলের বাড়ি। বাড়ির সামনের রাস্তার বিপরীতেই ‘আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়্যাহ’ নামে শিশুদের কওমী মাদ্রাসা। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার বাড়ির সামনে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক নাসির উদ্দিন সরু রাস্তা দিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় এমপির মেয়ে মেহজাবিন জান্নাত অনন্যার গায়ে ধাক্কা লাগে। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে অনন্যাকে মারপিট করা হয়। এসময় তার হাতের একটি আঙুল ভেঙে যায়। টের পেয়ে এমপির স্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে মেয়েকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে তাকেও মারপিট করা হয়। একপর্যায়ে অনন্যা নিজেই পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক আলোচনার মাধ্যমে উভয়পক্ষকে শান্ত করে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। মঙ্গলবার সকালে মাদ্রাসা শিক্ষক নাসির উদ্দিন ও কয়েকজন অভিভাবক এমপি অধ্যাপক গোলাম রসুলকে বিষয়টি অবগত করতে যান। এমপি গোলাম রসুল তাদের জানান, বিষয়টি আগের দিনই পুলিশ মীমাংসা করে দিয়েছে। তা ছাড়া তার মেয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ, যার আচরণের ওপর পরিবারের সবসময় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এমপির এই বক্তব্যে উপস্থিত শিক্ষক ও অভিভাবকদের একাংশ সন্তুষ্ট হতে না পেরে বাসার সামনে এসে হট্টগোল শুরু করে। একপর্যায়ে কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই অনন্যা বাসা থেকে বের হয়ে এসে এক শিক্ষককে চড় মারেন। ওইসময় সেখানে উপস্থিত এক নারী অভিভাবকের মাথায় তালা দিয়ে আঘাত করেন মানসিকভাবে অসুস্থ অনন্যা। এতে ঘটনাস্থলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতির অবনতি হতে দেখে সংসদ সদস্য ও তার স্ত্রী কলেজ শিক্ষক শারমিন ভিনা দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে মেয়ে অনন্যাকে সামলে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান। এসময় এমপির সামনেই তার মেয়ে অনন্যাকে মারধর করে নারী অভিভাবকরা। এদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লোকজনের একাংশ ও অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ হয়ে এমপির বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়ে হৈচৈ শুরু করেন। যশোর-নড়াইল সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এসময় নারীদের সাথে যোগ দিয়ে কিছু যুবককে ‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও, ‘বিচার চাই, বিচার চাই, রাজাকারের বিচার চাই’ বলে স্লোগান দিতে দেখা যায়। লুঙ্গিপরা জনৈক ব্যক্তি এমপির মেয়েকে নানাভাবে কটুক্তি করতে থাকেন। সংবাদ পেয়ে যশোর কোতোয়ালি থানা পুলিশ এবং ডিবি পুলিশের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুম খান বলেন, এমপি মহোদয়ের মেয়ের সাথে পূর্বে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জের ধরে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা খবর পেয়ে দ্রুত পৌঁছে উভয়পক্ষের সাথে কথা বলি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। বর্তমানে এলাকার পরিবেশ সম্পূর্ণ শান্ত রয়েছে। এই ঘটনায় নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইসাথে এমপির পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে। পুরো ঘটনাকে অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে এমপি অধ্যাপক গোলাম রসুল জানান, তার মেয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় অনিচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মেয়ের এই আচরণের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং সবাইকে ধৈর্য ধারণ করে শান্ত থাকার অনুরোধ করেছেন। এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে দুপুরে জেলা যুবদলের সেক্রেটারী আনছারুল হক রানা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মোস্তফা আমির ফয়সাল, জেলা জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি অধ্যাপক মোঃ শামসুজ্জামান, মাওলানা রেজাউল করিম, শহর জামায়াতের আমির মাওলানা ইসমাইল হোসেন, মো: বদরুজ্জামান, শেখ আহম্মদ আলী মুকুলসহ নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। এদিকে মাদ্রাসার শিক্ষক নাছির উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, আমরা চাই এমপি সাহেবের মেয়েকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হোক। তার সাথে যোগ দিয়ে নারী অভিভাবকরাও উত্তেজিত হয়ে বাড়ি গেটে ইট দিয়ে আঘাত করে। পরবর্তিতে বিকেলে মাদ্রাসার শিক্ষক নাসির উদ্দিন কোতোয়ালী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। দড়াটানা মাদ্রাসার শিক্ষক ও আলেম ওলামারা ওই মাদ্রাসা পরিদর্শনে যান। এই ঘটনার পেছনে একটি পক্ষ ইন্ধন দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। এমপি অধ্যাপক গোলাম রসুল বাদী হয়ে থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে শহরের আইনজীবী সমিতি মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জেলা জামায়াত। মিছিলটি দড়াটানা ভৈরব চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। সমাবেশ শেষে বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা আবু জাফর সিদ্দিকী, প্রচার সম্পাদক শাহবুদ্দিন বিশ্বাস প্রমুখ।