স্পন্দন ডেস্ক : চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় কাটিয়ে দুর্গত এলাকার মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছেন। এ অঞ্চলের বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা সরজমিনে পরিদর্শন, উদ্ধার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং ত্রাণ বিতরণ শেষে ১৫ জুলাই সন্ধায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন চট্রগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বন্যা দুর্গতদের উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের সমন্বয়ক বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী জানান, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এই অঞ্চলের ৫টি জেলায় আনুমানিক ১০ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬০ জন মানুষ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। দুর্যোগ শুরুর প্রথম দিন থেকে প্রশাসনের জরুরি তৎপরতায় প্রায় ৪৫ হাজার ৭৫০ জন মানুষকে উদ্ধার করে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে কোথাও কোথাও বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় মানুষ নিজ নিজ বাড়ি-ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। সর্বশেষ গত ১৫ জুলাইয়ের সরকারি হিসাব অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখন মাত্র ২ হাজার ২৯৪ জন মানুষ অবস্থান করছেন; যার একটি বড় অংশই আজ বিকাল বা আগামীকালের মধ্যে ঘরে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের সমন্বয়ক বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করেন, '১১ জুলাই আপনাদের এলাকায় এসে আমি চট্রগ্ৰাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার এবং বান্দরবানে গেছি। প্রতিটি জেলায় বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের সাথে বৈঠক করেছি, কোথায় কি ধরণের প্রতিবন্ধকতা আছে; তা শুনেছি এবং তা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দিক নির্দেশনা দিয়েছি। বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন এবং ত্রাণ বিতরণ করেছি। বিশেষ করে যেসব এলাকার মধ্যবিত্ত মানুষ ত্রাণ কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়নি বা পানিবন্দি হয়ে থাকার কারণে খাবার পাচ্ছেন না; তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়ার কার্যক্রম অব্যাহত আছে এবং প্রতিটি কাজ জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অন্যান্য সংস্থা গুলোর সাথে সমন্বয় করে তা চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, পার্বত্য ও দুর্গম এলাকায় যেখানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল; সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চালানো হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও এই মহতি কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। গণমাধ্যম কর্মীদের কাছ থেকে বন্যাকবলিত মানুষের বিষয়ে তথ্য ও সহযোগীতা পেয়েছি। বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা নিজস্ব উদ্যোগেও ত্রাণ বিতরণ করেছেন বলে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন তার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন বিভাগ ও কোম্পানি ইতিমধ্যে ত্রাণ সামগ্রী জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছে এবং প্রশাসনের মাধ্যমে তা বন্যার্তদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন,চট্টগ্রাম জেলায় সশস্ত্র বাহিনী, পেট্রোবাংলা ও জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে ১৫ হাজার ২২৯ প্যাকেট শুকনো খাবার বিলি করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি আক্রান্ত উপজেলাগুলোতে ৩ হাজার প্যাকেট এবং জ্বালানি বিভাগ ৪ হাজার প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী দুর্গতদের মাঝে পৌঁছে দিয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ব্র্যাক, ইপসা ও জাগরণী ফাউন্ডেশনের মতো এনজিওগুলোর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত আরও ১১ হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার সুষমভাবে বিলিবণ্টন করা হয়েছে। বর্তমানে খাগড়াছড়ি জেলার সকল আশ্রয়কেন্দ্র সম্পূর্ণ খালি হয়ে গেছে এবং চট্টগ্রামে ১ হাজার ৪৯৫ জন, কক্সবাজারে ৩১০ জন, রাঙ্গামাটিতে ২৯৩ জন এবং বান্দরবানে ২০০ জন মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। দুর্গত এলাকাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক বন্যার তীব্রতায় অত্র অঞ্চলের বেশকিছু নির্দিষ্ট এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী ও সন্দ্বীপ উপজেলা; কক্সবাজারের রামু, পেকুয়া, চকরিয়া ও মাতামুহুরী; রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, জুড়াছড়ি ও কাউখালী; খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, মহালছড়ি, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা ও সদর উপজেলা এবং বান্দরবান সদর, নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও রুমা উপজেলার বেশ কিছু নিম্নাঞ্চল মারাত্মকভাবে প্লাবিত হয়েছিল। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ও নদীভাঙনে স্থানীয় গ্রামীণ রাস্তাঘাট এবং অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টিউবওয়েলগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কিছু এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতি দ্রুত পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও বোতলজাত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বর্তমানে সড়ক যোগাযোগ সচল করা ও ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামতের কাজ পুরোদমে চলছে। সংবাদ সম্মেলনে ত্রাণ বরাদ্দের খতিয়ান তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ কবলিত অঞ্চলের একটি মানুষও যেন এই সংকটে অনাহারে কষ্ট না পান, তা নিশ্চিত করতে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ৫টি ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় এ পর্যন্ত সর্বমোট ২ হাজার ১০৬ মেট্রিক টন চাল এবং ১ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১,২০০ মেট্রিক টন চাল ও ৮৫ লক্ষ টাকা; কক্সবাজারে ২৫৬ মেট্রিক টন চাল, ২০.৮৫ লক্ষ টাকা, ৭,৮৩০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৪,৫০০ জনের রান্না করা খাবার; রাঙ্গামাটিতে ২৯৫ মেট্রিক টন চাল ও ৩৫ লক্ষ টাকা; খাগড়াছড়িতে ৩০০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০.৫০ লক্ষ টাকা এবং বান্দরবানে ৫৫ মেট্রিক টন চাল, ৪ লক্ষ টাকা ও ৩,৮৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই দুর্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে এবং ত্রাণ কার্যক্রমকে গতিশীল করতে ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে সরাসরি তদারকি করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এমপি, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এমপি, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ। এছাড়া ঢাকা থেকে মাননীয় অর্থ মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব সার্বক্ষণিকভাবে ফোনে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রেখে দিকনির্দেশনা প্রদান করছেন। বন্যা পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী কৃষি খাতে এ অঞ্চলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভাগের প্রায় ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর আবাদী জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে এবং এর ফলে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৩৫ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই বৃহৎ সংখ্যক কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং আগামী মৌসুমে চাষাবাদ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে সার, বীজ ও বিশেষ কৃষি প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, সাময়িক এই ক্ষতি কাটিয়ে না ওঠা পর্যন্ত সরকার দুর্গত মানুষের পাশে থাকবে এবং প্রয়োজনীয় সকল পুনর্বাসন সুবিধা নিশ্চিত করবে।