ফরহাদ খান, নড়াইল : পাম্পে তেল না পেয়ে ট্রাকচাপা দিয়ে নড়াইল-ঢাকা-বেনাপোল জাতীয় মহাসড়কের পাশে তুলারামপুর এলাকায় তানভীর ফিলিং অ্যান্ড গ্যাস স্টেশনের ম্যানেজার নাহিদ সরদারকে (৩৩) হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সুজাত মোল্যাকে (৪৬) গ্রেফতার করেছে র্যাব। রোববার (২৯ মার্চ) বিকেলে যশোরের বাঘারপাড়া থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আটক সুজাত আলী নড়াইল সদরের পেড়লী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে। এর আগে ওইদিন দুপুরে যশোরের বেনাপোল থেকে ট্রাকটি জব্দ করেছে পুলিশ। সুজাত মোল্যার বাড়িতে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘর তালাবদ্ধ ছিল।
এদিকে, নাহিদ হত্যার প্রতিবাদে নড়াইল জেলার সব তেল পাম্প একদিনের (রোববার) জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন নড়াইল জেলা তেল পাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম আহবায়ক সাইফুল ইসলাম হিটু।
তিনি বলেন, তানভীর ফিলিং অ্যান্ড গ্যাস স্টেশনের ম্যানেজার নাহিদ হত্যার ঘটনায় নড়াইল জেলার ১০টি পাম্প একদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এর আগে শনিবার (২৮ মার্চ) রাত দুইটার দিকে ট্রাকে তেল না পেয়ে ট্রাকচালক নড়াইল সদর উপজেলার পেড়লী গ্রামের সুজাত মোল্যা তানভীর ফিলিং অ্যান্ড গ্যাস স্টেশনের ম্যানেজার নাহিদ সরদারকে পাম্পের পাশে মহাসড়কের ওপর ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহত নাহিদ পেড়লী গ্রামের আকরাম সরদারের ছেলে। এ সময় নাহিদের সঙ্গী চামরুল গ্রামের জিহাদ মোল্যাকেও (২৭) ট্রাকচাপায় দিয়ে ডান পা ভেঙে দেয়া হয়েছে। ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে তার পায়ের অস্ত্রোপচার চলছে। আহত জিহাদ চামরুল গ্রামের জহুর আলীর ছেলে।
তেলপাম্পের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার রাতে তেল না পেয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে ট্রাকচালক সুজাত ওই পাম্পেই অবস্থান করেন। রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে ফিলিং স্টেশনের কাজ শেষ করে নাহিদ মোটরসাইকেলযোগে সহকর্মী জিহাদকে নিয়ে বাড়িতে যাওয়ার সময় পাম্প থেকে ট্রাক চালিয়ে দ্রুত গতিতে তাদের পেছনে ধাওয়া করে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়।
এ বিষয়ে তুলারামপুর হাইওয়ে থানার ওসি সেকেন্দার আলী বলেন, নাহিদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোববার দুপুরে বেনাপোল থেকে ট্রাকটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় জব্দ করা হয়েছে।
নড়াইল সদর থানার ওসি ওলি মিয়া জানান, সুজাত মোল্যাকে যশোর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টি এম রাহসিন কবির বলেন, খবর পেয়ে সরেজমিন গিয়েছি। পাম্পের নিরাপত্তার জন্য সব ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
এদিকে, ট্রাক চালক সুজাত আলীকে আটকের ঘটনায় যশোরের র্যাব সংবাদ সম্মেলন করেছে। রোববার দুপুরে যশোরের বাঘারপাড়া কিসমত মাহমুদপুর গ্রাম থেকে তাকে আটক করা হয়। সন্ধ্যায় র্যাব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন র্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মেজর এটিএম ফজলে রাব্বী প্রিন্স। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, নিহত নাহিদ সরদার নড়াইল সদরের পেড়লী গ্রামের আকরাম সরদারের ছেলে। তিনি নড়াইল-যশোর মহাসড়ক সংলগ্ন ‘মেসার্স তানভীর ফিলিং অ্যান্ড গ্যাস স্টেশনে’ ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শনিবার রাতে ট্রাক চালক সুজাত মোল্যা ও তার সহযোগী জহুর ওই পাম্পে ডিজেল নিতে যান। পাম্পে তেলের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় নাহিদ তেল দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। এ নিয়ে চালক ও তার সহযোগী ম্যানেজার নাহিদের সাথে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হন। একপর্যায়ে চালক ও তার সহযোগী ম্যানেজার নাহিদকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে সেখান থেকে চলে যান।
রাত ২টার দিকে ডিউটি শেষ করে ম্যানেজার নাহিদ ও তার সহকর্মী জিহাদ মোল্যা মোটরসাইকেলে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। ফিলিং স্টেশন থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে তুলারামপুর রেল ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে পেছন থেকে একটি দ্রুতগামী ট্রাক তাদের সজোরে ধাক্কা দেয় এবং মোটরসাইকেলের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।
ঘটনাস্থলেই নাহিদ সরদারের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত জিহাদ মোল্যাকে নড়াইল জেলা হাসপাতাল পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, ঘটনার পর থেকেই ট্রাকসহ আত্মগোপনে চলে যায়। তবে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় র্যাব-৬, সিপিসি-৩ (যশোর ক্যাম্প) এর একটি চৌকস দল যশোরের বাঘারপাড়ার কিসমত মাহমুদপুর গ্রামের তার শ্বশুর বাড়ি থেকে আটক করা হয়। গ্রেফতারকৃত সুজাত আলী তেল না পেয়ে ম্যানেজারকে হত্যার হুমকি দিয়ে কিছুদূর এসে ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ম্যানেজার ও তার সহকর্মী মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে কিছুদূর আসলে তারা তাদের চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর সুজাত আলী তার ট্রাকটি বেনাপোল পোর্ট এলাকায় ট্রান্সপোর্টে জমা দিয়ে দেয়। এরপর সে তার শ্বশুর বাড়ি কিসমত মাহমুদপুর এসে আত্মগোপন করে। র্যাব তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে দুপুরে আটক করেছে। পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থার জন্য তাকে নড়াইল জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।