বিল্লাল হোসেন : যশোর শহরের লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে রোগী আকৃষ্ট করার অভিযোগের সুরাহা হয়নি। দুই চিকিৎসক তাদের নামের সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলার জন্য মালিক পক্ষকে বললেও তা এখনো সরানো হয়নি। এমনকি সেখানে চেম্বার করেন না এমন আরেক চিকিৎসকের নামেও একটি কক্ষের সামনে সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার তৎপরতাও বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে গিয়ে এক্সরে করানোর বিনিময়ে মনির হোসেন নামে এক দালালকে ১০০ টাকা কমিশন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে কার্যক্রম পরিচালনা, চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার এবং সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আগেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এরপর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য সামনে এলেও সরেজমিনে সাইনবোর্ডে পরিবর্তন দেখা যায়নি। অনিয়ম বন্ধে স্বাস্থ্য বিভাগের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। লাইফ কেয়ারের সাইনবোর্ডে নাম থাকা ডা. সোনিয়া শারমিন ও ডা. নাজনীন পারভীন রিমি আগেই জানিয়েছেন, তারা সেখানে চেম্বার করেন না। সাইনবোর্ডে তাদের নাম ব্যবহার না করার জন্য মালিকপক্ষকে বলেছিলেন বলেও জানান তারা। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তাদের নামের সাইনবোর্ড এখনো সরানো হয়নি। এদিকে ডা. গোলাম মোর্তুজা সেখানে চেম্বার না করলেও একটি কক্ষের সামনে তার নামসংবলিত সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। ফলে চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে রোগীদের আকৃষ্ট করার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের অনুমতি ছাড়া নাম ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে চিকিৎসক সেখানে উপস্থিত না থাকলে সাইনবোর্ড দেখে আসা রোগীদের দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নও উঠেছে। অন্যদিকে, যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও থামেনি বলে দাবি স্থানীয় সূত্রের। হাসপাতালের চিহ্নিত দালাল হিসেবে পরিচিত মনির লাইফ কেয়ারে রোগী নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্যাথলজি পরীক্ষা ও এক্সরে করানোর জন্য রোগী সংগ্রহের বিনিময়ে কমিশন দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া প্রতি রোগীর এক্সরে করানোর ক্ষেত্রে মনিরকে ১০০ টাকা কমিশন দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে কমিশন লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম তদন্ত করা প্রয়োজন। এর আগে গত ৬ অক্টোবর যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মারুফ হোসেন ও আবিদ হাসান নামে দুজনকে আটক করে পুলিশ। সরকারি হাসপাতালের পরিচয় ব্যবহার করে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। পরে গত ৮ অক্টোবর দৈনিক স্পন্দনে লাইফ কেয়ারের অনিয়ম ও চিকিৎসা প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর সাইনবোর্ডে নাম থাকা দুই চিকিৎসক তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেন। কিন্তু এখনো সাইনবোর্ড না সরায় অভিযোগের নিষ্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যশোর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের আগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে লাইফ কেয়ারকে অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৮৩৮৩। লাইসেন্সটির মেয়াদ ছিল ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত। এরপর বিভিন্ন ত্রুটির কারণে লাইসেন্স নবায়ন হয়নি বলে জানা গেছে। লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কীভাবে চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের নাম ব্যবহারের অভিযোগ এবং হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত কত দূর এগিয়েছে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। আগের সংবাদ প্রকাশের পর সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে লাইফ কেয়ার কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে হাজির হতে বলা হয়েছিল। রোববার কাগজপত্র যাচাইয়ের কথা জানানো হলেও মালিকপক্ষের একজন ঢাকায় যাওয়ায় তাদের ডাকা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন। লাইফ কেয়ারের মালিক জিনিয়া শারমিন অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সরকারি হাসপাতাল থেকে কোনো রোগী ভাগিয়ে নেওয়া হয় না। চিকিৎসকদের নামসংবলিত সাইনবোর্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, রোগীর চাহিদা অনুযায়ী অনকলে চিকিৎসক ডাকা হয়। তবে অনকলে চিকিৎসক ডাকার ব্যবস্থা থাকলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক সেখানে নিয়মিত চেম্বার করেন কি না, সাইনবোর্ডে নাম ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে কি না এবং রোগীদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে নাম ব্যবহার না করার অনুরোধ করা হয়ে থাকলে এরপরও সাইনবোর্ড না সরানোর কারণ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, লাইফ কেয়ারের অনিয়মের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। সুযোগমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সাইনবোর্ডে চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার বিষয়ে কোনো চিকিৎসক এখনো তার কাছে অভিযোগ করেননি বলেও জানান তিনি। মালিকপক্ষকে তলব করার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের একজন ঢাকায় যাওয়ার কারণে ডাকা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনিয়ম ও চিকিৎসা প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে গত ৮ ও ১১ অক্টোবর দৈনিক স্পন্দনে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপরও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।