বিল্লাল হোসেন : ঘটন-অঘটন কিছু ঘটলেই মোবাইল হাতে ফেসবুক লাইভে হাজির। তথ্য যাচাইয়ের বালাই নেই, দায়িত্বশীলতার প্রশ্নও নেই। কে দোষী, কে নির্দোষ—তা জানার আগেই শুরু হয়ে যায় ভিডিও, পোস্ট আর মুখরোচক মন্তব্যের বন্যা। সত্য উদঘাটনের আগেই যেন রায় দিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা। মুহূর্তেই একজন নিরপরাধ মানুষকে ‘দুর্বৃত্ত’ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর কারও সামাজিক সম্মানকে পুঁজি করে চলছে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের নোংরা খেলা। যশোরে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওকেন্দ্রিক এমন অপচর্চার অভিযোগও কম নয়। কেউ কেউ সংবাদ সংগ্রহের চেয়ে ভিডিওর ভিউ, ভাইরাল হওয়া এবং ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের দিকেই বেশি মনোযোগী। এতে বিভ্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, প্রশ্নের মুখে পড়ছে পেশাদার সাংবাদিকতাও। সাংবাদিকতা কোনো ফেসবুক লাইভের প্রদর্শনী নয়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে দু-চারটি কথা বললেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তথ্য যাচাই, প্রমাণ, একাধিক পক্ষের বক্তব্য, জনস্বার্থ এবং পেশাগত নৈতিকতা। অথচ এসবের তোয়াক্কা না করেই অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফেসবুকার নিজেদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ে হাজির করছেন। সংবাদ আর মনগড়া বক্তব্যের সীমারেখা মুছে দিয়ে তারা তৈরি করছেন এক ভয়ংকর বিভ্রান্তি। এর দায় শেষ পর্যন্ত এসে পড়ছে প্রকৃত সাংবাদিকদের ওপর, যারা বছরের পর বছর মাঠে ঘাম ঝরিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং সত্যতা যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, একটি যাচাইহীন ভিডিও, একটি মিথ্যা অভিযোগ কিংবা একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরে সত্য প্রকাশ পেলেও অপমানিত মানুষের হারানো মর্যাদা কি আগের জায়গায় ফিরে আসে? যায় না। কয়েক হাজার ভিউ, কিছু লাইক কিংবা সাময়িক ভাইরাল হওয়ার উন্মাদনার জন্য একজন মানুষের সামাজিক সম্মানকে বলি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। ফেসবুকের ভিউ বাড়ানো সাংবাদিকতা নয়, কাউকে হেয় করে জনপ্রিয় হওয়াও সাংবাদিকতা নয়। ব্যক্তিগত বিরোধ, ক্ষোভ কিংবা স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করা হলে সেটি সংবাদ পরিবেশন নয়—সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে অপচর্চা। মনে রাখা দরকার, যশোরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরা সবার হাতে থাকতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার দায়িত্ব, বিবেক ও জবাবদিহি সবার হাতে থাকে না। লাইভে যাওয়ার আগে তথ্য যাচাই করুন, অভিযোগ করার আগে প্রমাণ দেখুন, আর কারও সম্মানহানি করার আগে একবার ভাবুন—আপনার ভুলের মাশুল আপনাকে নয়, অন্য একজন মানুষকে দিতে হতে পারে। সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যাজে নয়, ভিউতে নয়, ক্যামেরার দাপটে নয়—সাংবাদিকতার আসল পরিচয় সত্য অনুসন্ধান, নির্ভুল তথ্য, নৈতিকতা ও মানুষের আস্থা। যশোরে ভিউয়ের নেশায় সত্যকে আড়াল করে সাংবাদিকতার নাম কলঙ্কিত করার এই অপচর্চা বন্ধ হোক। সংবাদ প্রকাশের অধিকার আছে, কিন্তু কারও সম্মান ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই। লেখক- সাংবাদিক