ক্রীড়া প্রতিবেদক : ফ্রান্সকে থামিয়ে ১৬ বছর পর ফাইনালে উঠলো স্পেন। ‘এই ফ্রান্সকে কে থামাবে?’ গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে এই ছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে দলটা নামলেই নিদেনপক্ষে দুটো গোল করেই দিচ্ছে, সেই দলটাকে হারাবে কে, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কে জানত প্রশ্নের জবাবটা থাকবে স্পেনের কাছে? তাও এভাবে! এই ফ্রান্স ফাইনালের আগে থামবে, শেষ চারে হারবে ২-০ গোলে, আপনি ভেবেছিলেন?। আপনি আমি না ভাবলেও লামিন ইয়ামালের কাছে জবাবটা ছিলই। তীব্র আত্মবিশ্বাসে ম্যাচের আগে বলেছিলেন, ‘আমাদের ফ্রান্সকে নয়, ফ্রান্সেরই আমাদেরকে ভয় পাওয়া উচিত; আমরা তাদের দুই বার হারিয়ে এসেছি।’ সে কথার পর স্পেনের খেলাটা হতে হতো একেবারে নিখুঁত, স্প্যানিয়ার্ডরা সেটা করে দেখাল। ওদিকে প্রশ্নটা ফ্রান্সের অহমে আঘাত করাই উচিত ছিল। তার জবাবটাও হওয়া উচিত ছিল সমুচিত। ফরাসিরা সে জবাবটা দিতে পারেনি। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দলটা ছিল দ্বিতীয় সেরা দল হয়ে। স্পেন খেলেছে, বুঝিয়েছে, কেন টুর্নামেন্টের আগে তাদেরকে ফেভারিট বলা হয়েছে, তারা বুঝিয়েছে, তাদেরকে কেন ইএ স্পোর্টস টুর্নামেন্টের আগেই সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন বলে ঘোষণা দিয়েছে।ইয়ামাল হুঙ্কারটা ছেড়েছিলেন। তিনিই করে দিয়েছিলেন শুরুটা। না, গোলের খাতায় নাম নেই তার; কিন্তু তার প্রভাব ছিল বিস্তর। পেনাল্টিটা এসেছে ২০ মিনিটে। দারুণ চৌকস এক দৌড়ে পেনাল্টিটা এনে দিয়েছিলেন মিকেল ওইয়েরজাবালকে। অফ দ্য বলে তার দৌড়ের তাল সামলাতে না পেরে তাকে লাথিই মেরে বসেন লুকাস দিনিয়ে। ওইয়েরজাবাল যখন পেনাল্টি নিতে দাঁড়ালেন, তখন গ্যালারিতে একটা চাপা উত্তেজনা। শেষ পাঁচটা পেনাল্টিতে গোল করেছেন তিনি, সেই পরিসংখ্যান হয়তো সাহস জুগিয়েছিল। কিন্তু পরিসংখ্যান কি আর মানুষের বুক ধড়ফড়ানি থামায়? থামায় না। হাজার হোক, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো মঞ্চ তো! তবে ওইয়েরজাবাল পা হড়কালেন না। ইউরোর ফাইনালে গোল ছিল তার, সেটাও কি একটু আত্মবিশ্বাসের জ্বালানি হয়ে দাঁড়িয়েছিল? হয়তো! সেই জ্বালানির বলেই কি না কে জানে, তার শটটা গেল আগুনে গতিতে। এমন এক টুর্নামেন্ট, যেখানে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পের পা পেনাল্টি মিস করেছে, সেই টুর্নামেন্টে, এমন মঞ্চে এসে এমন পেনাল্টি নিতেও সাহস লাগে। তিনি সে সাহসটা করলেন; নিখুঁত, নির্মম গতিতে নিলেন শটটা। মাইক মেনিওঁ ঝাঁপিয়েছিলেন ঠিক দিকেই; কিন্তু কী লাভ হলো তাতে? কখনো কখনো সঠিক অনুমানও যথেষ্ট নয়। সময় তখন অন্য কারো পক্ষে কথা বলে। এই পেনাল্টির কুশীলব ইয়ামাল পরে একবার বল জালে জড়িয়েছিলেন। কিন্তু গোলটা বাতিল হলো অফসাইডে, ৩-০ হতে হতে হলো না। কিন্তু সেই বাতিল হওয়া গোলটাও যেন একটা বার্তা দিয়ে গেল ফ্রান্সের ডাগআউটে; এই স্পেনের কাছেই সমাধি রচিত হবে তোমাদের বিশ্বকাপ স্বপ্নের। সেটা হলোও! নাও হতে পারত। দেজিরে দুয়ে হয়তো তার জন্য নিজেকে দুষবেন। সিমনের ভুল ক্লিয়ারেন্স, বল একদম ফাঁকায়, শুধু একটা শট দরকার ছিল। কিন্তু দুয়ে এক মুহূর্ত দেরি করলেন। শুধু এক মুহূর্ত। ফুটবলে এক মুহূর্ত মানেই তো একটা গোটা জীবন! মুহুর্তের ভুলে কত রথী মহারথীর আশা ভেঙে গেছে অকালে! সেই মুহূর্তটা পার হয়ে গেলে আর ফেরে না। সিমন ততক্ষণে ফিরে এসেছেন, বল লেগেছে তার গায়ে। কী নিষ্ঠুর খেলা এটা, বলুন তো? একটা সেকেন্ডের দ্বিধায় বদলে যায় ইতিহাস।স্পেনের ফুটবলটা এই আসরে যেন একটা দর্শন হয়ে উঠেছে। কাজটা সহজ একেবারেই। ‘বল দখলে রাখো, ধৈর্য ধরো, সময়কে নিজের পক্ষে টেনে আনো’। পেদ্রো পোরোর গোলটা সেই দর্শনেরই প্রতিচ্ছবি। দানি অলমোর এক ছোঁয়ার পাস, আর পোরোর নিখুঁত ফিনিশ। কোনো তাড়াহুড়া নেই তাতে, কোনো আকস্মিকতা নেই। যেন এটাই হওয়ার কথা ছিল। বিশ্বকাপের আগে মাদ্রিদের কোনো খেলোয়াড় দলে না টানা, আর বার্সেলোনার ৮ খেলোয়াড় দলে ডাকা নিয়ে বেশ গঞ্জনাই সইতে হয়েছে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে। তিনি এই সিদ্ধান্তটা কেন নিয়েছেন, তার জবাবটা বার্সার ফরোয়ার্ডরাই দিয়েছেন। গোল পাননি, কিন্তু দুটো গোলই এসেছে তাদের কারসাজিতে। তাদের মাইনাস করে দিলে সে গোলদুটোও পায় না স্পেন! আর ফ্রান্স? ফ্রান্স যেন আজ রাতে নিজের ছায়ার সঙ্গে লড়ল। সালিবাকে হারানোর পর তাদের রক্ষণ যেন হঠাৎ বয়স্ক হয়ে গেল, ক্লান্ত হয়ে গেল দ্রুতই। যে দলটা গত বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলেছিল, এবারও যারা খেলছিল ফেভারিটের মতো করে, তারা আজ যেন মেনে নিল-কিছু রাত তোমার জন্য নয়। কিছু রাত অন্য কারো। খেলা শেষের বাঁশি বাজতেই স্পেনের খেলোয়াড়েরা ছুটলেন একে অন্যের দিকে। কিন্তু চোখ আঁতিপাঁতি করে খুঁজছিল সালিবাকে, তিনি বেঞ্চে বসে ছিলেন, বরফ চেপে ধরে পায়ে, চোখে সেই শূন্যতা যা শুধু ক্রীড়াবিদরাই চেনেন। যখন শরীর জানে মনের চেয়ে আগে যে, স্বপ্নটা এবার শেষ। ওদিকে স্পেন, কেপ ভার্দের বিপক্ষে বিশ্বকাপের শুরুটা যাদের হয়েছিল বড্ড বিবর্ণ, যাদের ফেভারিট তকমা নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন… সেই স্পেনই চলে গেল ফাইনালে। ক্যাসিয়াস, পুয়োলদের সোনালী প্রজন্মের সোনায় মোড়ানো বিশ্বকাপের ১৬ বছর পর আবারও শিরোপা থেকে হাতছোঁয়া দূরত্বে চলে গেল লা ফিউরিয়া রোহারা।