নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রত্যন্ত গ্রাম। দোচালা টিনের জরাজীর্ণ আধাপাকা ঘর, কিন্তু আজ সেখানে আনন্দের জোয়ার। অজপাড়াগাঁয়ের এক সাধারণ শিক্ষার্থী আজ পুরো দেশের গৌরব। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান বাচ্চু রহমান। ছোটবেলা থেকে আনসার সদস্য বাবার ইউনিফর্ম, বুট আর বেল্ট নিয়ে খেলতে খেলতেই বুনেছিলেন স্বপ্নের বীজ। প্রথমে কনস্টেবল হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও পরিশ্রম একাগ্রতা আর শৃঙ্খলায় ধরা দিয়েছে বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম। তবে পথটা সহজ ছিল না। ছিল ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা আর নানা চ্যালেঞ্জ। ৪৫তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতেই বাদ পড়েছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি এই লড়াকু তরুণ। ৪৯ তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ হওয়ার পর গত ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে দেশজুড়ে প্রথম হয়েছেন বাচ্চু। তার এই সাফল্যে এখন যেমন একদিকে পুরো গ্রামজুড়ে আনন্দের জোয়ার বইছে; অন্যদিকে এই সাফল্য আজ দেশের লাখো তরুণের অনুপ্রেরণাও যুগিয়েছে। যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের আনসার বাহিনীর সদস্য নজরুল ইসলাম ও গৃহিনী বিলকিস বেগম দম্পত্তির দুই সন্তানের মধ্যে বাচ্চু ছোট। কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা থেকে ২০১৫ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫, স্থানীয় পাঁজিয়া মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি ২০১৭ সালে উর্ত্তীণ হন। এরপর ২০১৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন। বাচ্চু বিসিএস জয়ের এই লড়াইয়ে প্রস্তুতির কৌশলটিও অন্য যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য দারুণ শিক্ষণীয়। কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের ছাত্র হওয়ায় তিনি কখনোই মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে বিশ্বাস করেননি। শুধু তথ্য মুখস্থ করার চেয়ে বিষয়টি কেন ঘটছে এবং তার সমাধান কী-সেটি গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতেন। বিসিএসের প্রথাগত বইয়ের বাইরেও তিনি নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা পড়তেন। পড়ালেখার প্রতি প্রবল আগ্রহের জায়গায় অভাব অনটন বাধা হতে দেয়নি পরিবারও। বাচ্চুর মা বিলকিস বেগম বলেন, ‘কত অভাব অনটন, তার মধ্যেও ছেলেদের মানুষ করার চেষ্টা ছিলো ওর বাবার। চাকুরির যে টাকা প্রায় সব চলে যেত তাদের পড়াশোনা করাতে। ছোটবেলা থেকে বাচ্চু পড়াশোনাতে মনোযোগী ছিলনা। জেএসসি পরীক্ষার পর স্কুলের পিকনিক থেকে ফিরে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ে। দিন কিংবা রাত বই নিয়ে ঘর উঠান কিংবা বাগানে পড়েছে সে। অনেক সময় বই কেড়েও নিতে হয়েছে তার কাছ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ার সময়ে অনেক কষ্ট করেছে। তার এই কষ্ট সৃষ্টিকর্তা পুরস্কার দিয়েছে। তারই সাফল্য পুরো গ্রামবাসী আজ খুশি।’ বাচ্চু রহমান জানান, ‘ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পুলিশের কনস্টেবল হওয়ার। কারণ বাবা আনসার সদস্য ছিলেন। তার ইউনিফর্ম, বুট, বেল্ট নিয়ে খেলতে খেলতেই বড় হয়েছি। তখন থেকেই মনে হতো, পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে চাকরি করব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারি, বিসিএসের মাধ্যমে এএসপি হওয়া যায়। তখনই লক্ষ্য স্থির করি পুলিশ ক্যাডারেই যাব। ক্যাম্পাস জীবনে প্রচুর পত্রিকা পড়তাম। এতে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক ও সাইবার অপরাধের চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠত। এগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করার প্রবল ইচ্ছা থেকেই এই ক্যাডারের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে। ৪৯তম বিসিএসে মার্কেটিংয়ে সুপারিশ হয়েছি। শিক্ষকতা অবশ্যই সম্মানজনক পেশা। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, পুলিশে থেকে মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার সুযোগ বেশি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকেই পুলিশ ক্যাডার বেছে নিয়েছি। পদ বা পদবি নয়; একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই। মানুষ বিপদে পড়লে সাধারণত ডাক্তার বা পুলিশের কাছে যায়। এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই, যাতে ভুক্তভোগী মানুষ পুলিশের প্রতি আস্থা পান। সততার সঙ্গে দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হবে।’ হাল না ছাড়ার জেদ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো ব্যর্থতাকে যে সাফল্যে রূপান্তর করা যায়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন বাচ্চু বলে জানান কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সবুর। তিনি বলেন, ‘ব্যর্থতার স্তূপ ডিঙিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা বাচ্চু রহমানের দেশসেবার এই অনন্য কৃতিত্বে আজ গর্বিত পুরো কেশবপুরবাসী। বাচ্চু ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত বিনয়ী ও মেধাবী ছিলেন। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক কৌশল আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো বড় স্বপ্নই ছোঁয়া সম্ভব। তার এই অভাবনীয় সাফল্য আজ দেশের লাখো চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীর জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা ও শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’