মাসুম বিল্লাহ : “এই বিশ্বের মাঝে যা কিছু মহান, সৃষ্টির চিরকল্যাণকর-অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই চিরন্তন বাণীর বাস্তব প্রতিচ্ছবি যেন যশোর সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের কায়েতখালী গ্রামের নারী উদ্যোক্তা নাদিরা সুলতানা। শিক্ষিত বেকারদের মতো চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই জীবনের অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। বিএ পাস করা নাদিরা সুলতানা আজ একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। টমেটো, তরমুজ, ভুট্টা, আলু, মাছ ও বিভিন্ন সবজি চাষ করে তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, হয়ে উঠেছেন এলাকার নারীদের অনুপ্রেরণার প্রতীক। সম্প্রতি তার টমেটো ক্ষেতে গিয়ে দেখা যায়- থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল-সবুজ রঙের দৃষ্টিনন্দন টমেটো। বাড়ির আঙিনায় স্থাপিত পলি হাউসের ভেতরে বারি-৮ ও মিন্টু সুপার-৩০ এবং ৩৮ জাতের টমেটো চাষ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন তিনি। নাদিরা সুলতানা জানান, চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় দুই বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন। প্রতিদিন গড়ে ৩ মণ টমেটো সংগ্রহ করে বাজারজাত করছেন। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি মণ টমেটো ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। টমেটো ক্ষেত থেকে ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকার ফসল বিক্রি করেছেন। যেখানে তার মোট উৎপাদন খরচ হয়েছে মাত্র ৬৫ হাজার টাকার মতো। তিনি বলেন, “২০১১ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করি। প্রথমবার এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করে লোকসান গুনতে হয়েছিল। কিন্তু হতাশ হইনি। ধীরে ধীরে তরমুজ, ভুট্টা, আলু, মাছ, সবজি ও টমেটো চাষে যুক্ত হই। আজ কৃষির কারণেই আমার জীবনে বড় পরিবর্তন এসেছে।” নাদিরা আরও জানান, কৃষিকাজ থেকে অর্জিত আয়ে তিনি প্রায় ১৫ লাখ টাকার জমি কিনেছেন, ৩৪ লাখ টাকার গাড়ি কিনেছি । কৃষি যন্ত্রপাতি ও সম্পদ অর্জন করেছেন এবং মেয়েকে উচ্চশিক্ষার জন্য কি কি স্থানে পাঠিয়েছি।সবই কি কাজ করে আমি যখন প্রথম কৃষি কাজে আসি ৩০ টাকা ২০১০-১১ সালে এম এল এ ব্যবসায়ী আমি ২৫ লাখ টাকা মার খেয়ে এখানে চলে আসি। তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক পরিচর্যা করলে কৃষিতে সফল হওয়া সম্ভব। তার স্বামী অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট সোজাউদ্দৌলা কলিম বলেন- “আমরা তরমুজের ক্ষেতে সাথী ফসল হিসেবে টমেটো চাষ করেছি। পরিকল্পিত চাষাবাদ ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চলার কারণেই ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে।” ইছালী ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জহির রায়হান বলেন- “নাদিরা সুলতানা একজন পরিশ্রমী ও সফল নারী কৃষক। তার উৎপাদিত টমেটো নিরাপদ ও সুস্বাদু। তাকে দেখে এলাকার বেকার নারী-পুরুষ কৃষিকাজে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সবসময় কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।” নাদিরা সুলতানা জানান- পলিহাউস ব্যবহারের কারণে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার ক্ষতি থেকে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, “কারও যদি ১০ শতক জমিও থাকে, তাহলেও টমেটো চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব। কৃষিকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে সফলতা আসবেই।” তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৭ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর হাত থেকে ‘ক্রেস্ট অব মেরিট’ লাভ করেন। এছাড়া ২০১৯ সালে যশোর সদর উপজেলা কৃষি অফিসের সেরা কৃষক পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি। ২০২৪ সালে বঙ্গমাতা কৃষি পুরস্কারের জন্যও তালিকাভুক্ত হন।অভ্যুত্থানের কারণে সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়াও অসংখ্য ট্রেনিং এবং পুরস্কার পেয়েছেন। নাদিরা সুলতানার এই সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে, কৃষি শুধু জীবিকা নয়, এটি হতে পারে অর্থনৈতিক মুক্তি ও আত্মপ্রতিষ্ঠার শক্তিশালী হাতিয়ার। যশোরের এই নারী উদ্যোক্তার মতো আরও হাজারো নাদিরা গড়ে উঠুক দেশের প্রতিটি গ্রামে-এমনটাই প্রত্যাশা সচেতন মহলের।