নিজস্ব প্রতিবেদক : গত কয়েকদিন ধরে গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়েছে যশোরের প্রাণ-প্রকৃতি। অব্যাহত তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রায় দু’সপ্তাহের মৃদু তাপপ্রবাহের পর এবার এই জেলায় মাঝারি তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৬। যা দেশে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এটি। তবে সারাদিন প্রচণ্ড তাপের পর বৃহস্পতিবার রাত ৮টার পরে বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি নেমে আসে।
বুধবার যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিলো ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে যশোর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমান ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণাধীন আবহাওয়া অফিস। তারা বলেছেন বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজ শুক্রবারও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
শহরের দড়াটানার ফল বিক্রেতা সোহেল হাসান জানান, গত কয়েকদিন ধরে যশোরে চিল প্রচন্ড গরম। তীব্র গরমে আমাদের বিক্রি হচ্ছেনা।
তবে রাত ৮টার পর বৃষ্টি হলে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি।
এদিকে, যশোরে মাঝারি তাপপ্রবাহে গোটা প্রাণ-প্রকৃতি দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দুপুরের দিকে রাস্তা, ঘাট, ফসলের ক্ষেতে মরুর উত্তাপ বিরাজ করছে। ঘরের বাইরে বের হলেই আগুনের হল্কা গায়ে লাগছে। শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন চরম ভোগান্তিতে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সূর্যের তাপ এতই বেশি যে, খোলা আকাশের নিচে হাঁটলেও গরম বাতাস শরীর যেন ঝলসে দিচ্ছে। যাত্রাপথে ছাতা মাথায় দিয়ে তাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকেই। স্বস্তি পেতে শ্রমজীবী মানুষ রাস্তার পাশে জিরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ হাতে মুখে পানি দিয়ে ঠাণ্ডা হওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউবা শরবর, আখের রস, স্যালাইন পানিতে শরীর শীতল করার চেষ্টা করছেন।
মুজিব সড়কের সার্কিট হাউজের সামনে রিকসা নিয়ে ছাঁয়াতে বিশ্রাম করতে দেখা যায় নুরুল ইসলাম নামে এক চালককে। তিনি বলেন, ‘গরমে রিকসা চালালে গায়ে যেনো আগুনের ছ্যাকা লাগছে। তারপরও রিকসা চালাতে হচ্ছে। কিন্তু ঠিকমত ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। গরমে বাইরে মানুষ কম আসছে। দড়াটানা চৌরাস্তা থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া নিয়ে গেলেও খালি ফিরে আসতে হচ্ছে। যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।
শহরের লালদীঘিপাড়ে আখের রস বিক্রি করেন কালাম হোসেন। তিনি জানালেন, প্রচন্ড গরমে অনেক মানুষ আসছে আখের রস খেতে। কিন্তু রস বিক্রি করতেও রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। ছায়া খুঁজে দাঁড়িয়ে রস বিক্রি করতে হচ্ছে।
চলমান তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বিপাকে পড়া শ্রমজীবী মানুষ তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষা পেতে মাথায় টুপি অথবা গামছা পরে চলাচল করছেন। কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরা ক্লান্ত দেহ নিয়ে ছায়ায় বিশ্রাম করছেন। গরমের হাত থেকে শরীরকে শীতল করে জুড়িয়ে নিতে শহর থেকে কিশোর-যুবকেরা দল বেঁধে ছুটছে গ্রামাঞ্চলে নলকূপগুলোতে গোসল করতে।
চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বের হয়ে যাওয়ায় পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমিভাব, রক্তচাপের ওঠানামা এবং তাপজনিত বিভিন্ন অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এদিকে, ভ্যাপসা গরমের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে হাসপাতালগুলোতেও। যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গরমজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, বর্তমানে তাপমাত্রার পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক বেশি থাকায় মানুষ বেশি অস্বস্তি অনুভব করছে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি ও ইলেকট্রোলাইট বের হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকের পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও অন্যান্য তাপজনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে বিশেষ করে পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইন গ্রহণ করা প্রয়োজন যাতে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি কমে আসে। প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়া এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সামাজিকভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান রইল।