অসীম মোদক, মহেশপুর : মহেশপুর পৌরসভায় ব্যাপক অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে সরকারি ড্রেন নির্মাণকাজ। এ কাজ নিয়ে পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের ঘুষ দাবির একটি অডিও রের্কড ফাঁস হয়েছে।
ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ে এক পর্যায়ে তাকে ঠিকাদারের উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, কাজের এক পার্সেন্ট আমার।
জানা যায়, পৌরসভার ড্রেন নির্মাণকাজের ইস্টিমেট অনুযায়ী বান্ডিং রড কম দেয়া, লিপটিং ক্লাপে ফিলেট রড ব্যবহার না করা, সিলেকশন পাথরের সঙ্গে কুষ্টিয়ার মোটা বালু ভেজালসহ ঢালাইয়ে সিমেন্টের পরিমান কম দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে ম্যানেজ করে অনিয়মের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন।
তবে ঘুষ দিতে রাজি না হলে বিভিন্ন ভাবে ঠিকাদারদের হেনস্তা করার অভিযোগও রয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
আইইউজিআইপি প্রকল্পের আওতায় মহেশপুর পৌরসভার ১ম ও ২য় ধাপে ৪২ কোটি টাকার ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণকাজ করছে র্যাবআরসি ও ডকইয়ার্ড নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে। এর আগে একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হলেও তৎকালীন পৌর প্রশাসকের মদদপুষ্ট হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘুষ দাবির বিষয়টি সাইফুল ইসলামের নিজের মুখে স্বীকার করার একটি অডিও রেকর্ডিং সাংবাদিকদের হাতে এসে পৌঁছেছে। ওই অডিও রেকর্ডিংয়ে ডকইয়ার্ড প্রকৌশলীদের উদ্দেশে উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে বলতে শোনা যায়, সব দিমু সব আপনাদের সাইডেও পাকশির বালি দিমু। চুক্তি করতেছি। র্যাবআরসি আমারে মাসে ৭৫ হাজার টাকা দেবে, কাজের এক পার্সেন্ট আমার। আর বাদবাকি টাকা আমারে বিলের সময় দেবে। এখন চার কোটি টাকার বিল চাই।
তিন কোটি টাকার বিল করতে গেলেও আমারে মাল দেয়া লাগবে। তা না হলে জেনুইন বিল দিয়া দিমু। বাড়তি দিমু না।
কইলাম গাড়াবাড়ীয়ায় দ্রুত ভেকু লাগান, যদি এক হাজার মিটার ড্রেন থাকে ৫০০ মিটার মাটি কাইটালন, চার কোটি টাকার বিল দিয়া দিমুনে। আমি হইলাম ইনচার্জ।
মহেশপুর পৌরসভায় যেখানে যে কাজ হইবে, সেই কাজের ইনচার্জ আমি।
আমার হিসাব নিকাশ আলাদা। আপনার ম্যানেজাররে কওয়া লাগে যে ভাই আমারে দুই হাজার টাকা দেন।
হেয় আমারে কয় হেড অফিসে কথা কন। আপনারা কি খয়রাতি। র্যাবআরসি বলছে, আমারে এক পার্সেন্ট টাকা দেবে। প্রতিমাসে দেবে ৭৫ হাজার টাকা, আর বাকি টাকা বিলের সময় দেবে।
ড্রেন নির্মাণকাজের মিস্ত্রি লিটন জানান, কাজ শুরু থেকে পৌরসভার গেট পর্যন্ত লিপটিং স্লাপের আগাগোড়া কোথাও ফিলেট রড দেয়া হয়নি। পৌরসভার উপ-প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রাতারাতি ঢালাই কাজ করিয়েছেন। মাছ হাটের ওই পাশের কালভার্ট থেকে মাঝখান পর্যন্ত বেশকিছু অংশে ডাবল খাঁচার পরিবর্তে রাতারাতি একটি করে খাঁচা দিয়ে সাইফুল ইসলাম ঢালাই করিয়েছেন। উনি প্রচুর পরিমাণে ঘুষ খাচ্ছেন। সাইফুল সাহেব নিজে সিলেকশন পাথরের সঙ্গে কুষ্টিয়ার বালি ভেজাল দিয়ে কাজ করিয়েছেন। এসব করিয়ে তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিচ্ছেন। যদি ঠিকাদারের ম্যানেজার টাকা দিতে না চান তাহলে হেড অফিসে ওই ম্যানেজারের নামে অভিযোগ দেন সাইফুল ইসলাম।
ডকইয়ার্ডের সদ্য চাকরি হারানো প্রকৌশলী বাকী বিল্লাহ জানান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম টাকা নেয়ার জন্য আমাদের চাপ দিতেন। টাকা না দিলে হুমকিও দিতেন। যখন-তখন ৫/১০ হাজার টাকা চেয়ে বসতেন। বলতেন ঠিকাদারকে বলেন আমাকে টাকা দিতে। উনার ভয়ে পৌরসভার কেউ কথা বলত না। উনি আমাদের সিমেন্ট বাঁচানো, রডের স্পেসিং বাড়ানো ও কুষ্টিয়ার বালু ভেজাল দিতে বলতেন। এছাড়া তিনি প্রতিদিন সাইডে আসার দরুন দুই হাজার করে টাকা দাবি করতেন।
রেকর্ডিংয়ের ব্যাপারে উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানান, ঠিকাদাররা আমাকে ঘুষ দিতে চান এটা বলেছি। আমি ঘুষ নিয়েছি এটা কিন্তু একবারও বলিনি। অনেক সময় অনেক বিষয়ে আলোচনা করি। মূলত আমাকে হেনস্তা করার জন্য গোপনে আমার কথাগুলো রেকর্ডিং করা হয়েছে।
সদ্য যোগদান করা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক সাজ্জাদ হোসেন জানান, আমি রেকর্ডিংটি শুনেছি, এটা খুবই দুঃখজনক। উনি যদি এ ধরনের কাজে যুক্ত হন তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া কোন পথ নেই।