❒বছরে ১০ কোটিরও বেশি টাকার চারা বিক্রি

বাসুদেবপুর গ্রাম জুড়ে নার্সারি

এখন সময়: মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই , ২০২৪, ০২:০৮:০০ পিএম

সালমান হাসান রাজিব : বাসুদেবপুর গ্রাম জুড়ে নার্সারি। কোথাও অনাবাদি নেই এক চিলতে জমি। গ্রামটির প্রত্যেকটি বাড়িতে বাড়িতে নার্সারি গড়ে উঠেছে। বসতবাড়ির সামনে, পেছনে ও ছাদেও ফলদ, বনজ ও রকমারি ফুলের চারা উৎপাদন হয়। এই ‘নার্সারি ভিলেজ’-এ বর্ষা মৌসুমেই ১০ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়। সারা বছরের বিক্রির এই টাকার অঙ্ক আরো অনেক বেশি।
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা ইউনিয়নের এই গ্রামে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা উৎপাদন হয় বিপুল পরিমাণ। বাসুদেবপুরের কয়েকশ’ নার্সারিতে ফুল, ফল, মশলাসহ হরেক রকমের গাছের চারার বেচাকেনা চলে বছরভর। ৩৫৬টি নার্সারি ছাড়াও গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়িতে চারা উৎপাদন হয়। যশোর ও আশপাশের জেলাসহ সারাদেশে যায় এখানকার চারা। নার্সারি মালিকদের দেয়া হিসেব মতে, শুধুমাত্র বর্ষার তিন মাসে দশ কোটি টাকার ওপর চারা বিক্রি হয়। বছর জুড়ে চারার বেচাবিক্রি চললেও বর্ষা মৌসুমে সেটি বহুগুন বেড়ে যায়।
বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারার মধ্যে বাসুদেবপুরে লিচু চারার বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। দিনাজপুরের চাষিদের কাছে বাসুদেবপুরের লিচু চারার কদর অনেক। এখানকার চাষিদের দাবি, সারা দেশের মধ্যে বাসুদেবপুরে সর্বোচ্চ পরিমাণ লিচুর চারা উৎপাদন হয়। মৌসুম চলাকালীন ৪০ থেকে ৫০ ট্রাকের ওপর লিচুর চারা বিক্রি হয়।
নার্সারি বাসুদেবপুরের মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। গ্রামটিতে নিরব অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটে গেছে। নার্সারি ব্যবসায় করে এখানকার বহু মানুষ সফল হয়েছেন। শূন্য থেকে কোটিপতিও হয়েছেন। লিজ নিয়ে নার্সারি গড়ে তুলে পরবর্তীতে জমি বাড়ির মালিক হয়েছেন। তাদের দেখাদেখি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গড়ে উঠছে নার্সারি। বছরজুড়ে ১০ কোটিরও বেশি টাকার চারা বেচাবিক্রি হয় বাসুদেবপুরের কয়েক’শ নার্সারিতে।
হতে চলল প্রায় অর্ধশতাব্দী। দীর্ঘ এই সময় ধরে নার্সারির ব্যবসা চলছে বাসুদেবপুরে। তবে শুরুর দিকের গল্পটা একটু অন্যরকম। ঠিক নার্সারি ব্যবসার চিন্তা থেকে এটির গোড়াপত্তন হয়নি। আজকের এই শত শত নার্সারি পথিকৃৎরা ‘বাচড়ায়’ (স্থানীয় ভাষায় পতিত জমি) দেশি মশলাসহ বিভিন্ন ফলের চারার আবাদ গড়ে তোলেন।
নিজেদেরসহ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই আবাদ থেকে বেশ কিছু মুনাফা হতো তাদের। উৎপাদিত চারা, কিম্বা নামমাত্র টাকার বিনিময়ে মালিকদের কাছে থেকে পতিত জমি নিয়ে এগুলোর উৎপাদন করতেন তারা। পতিত জমির মালিকদের অনেকে বিনে পয়সায়ও তাদের জমিতে এসবের আবাদ করতে দিতেন। মশলার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির চারার মধ্যে বিশেষ করে লিচু চারার আবাদ হতো সবচেয়ে বেশি। আর এই লিচু চারার হাত ধরেই এখানে ফলদ, বনজসহ রকমারি বৃক্ষের চারার উৎপাদন শুরু হয়।
বাসুদেবপুরের লিচুর চারা যায় দিনাজপুরে
সারা দেশের মধ্যে সর্বাধিক লিচুর চারা উৎপাদন হয় বাসুদেবপুরে। দিনাজপুরের চাষিদের কাছে এখানকার লিচুর চারার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রত্যেক বর্ষায় দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায় বাসুদেবপুরের লিচুর চারা। একেক মৌসুমে ৩০ থেকে ৪০ হাজারেরও বেশি লিচুর চারা দিনাজপুরে যায়। সেখানকার চাষিরা এখান থেকে লিচুর চারা কিনে নিয়ে যান। বাসুদেবপুরের বিভিন্ন নার্সারি থেকে ৪০ থেকে ৫০ ট্রাক লিচুর চালান যায়।
নার্সারির গোড়াপত্তনকারী মোহাম্মদ আলী মেম্বার সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ চারা উৎপাদনকারী চাষি হিসেবে একবার পুরস্কারও পেয়েছেন। স্থানীয় নার্সারি মালিকদের দাবি, দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ লিচুর চারা উৎপাদন হয় বাসুদেবপুরে। বষা মৌসুমেই ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার লিচু চারা চারা বিক্রি হয়। এ ছাড়াও সারা বছর এখানে লিচুর চারা বিক্রি হয়।
নার্সারি ব্যবসার গোড়াপত্তন
বাসুদেবপুরে নার্সারি ব্যবসার যাত্রা শুরু হয় মোহাম্মদ আলী মেম্বারের হাত ধরে। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে তিনি নার্সারির ব্যবসা শুরু করেন। তার ছেলেরা এখন সেই নার্সারি ব্যবসার হাল ধরেছেন। পারিবারিকভাবে তার ছেলেরা নার্সারি ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের এই নার্সারিটির নাম ‘পুরাতন নার্সারি’। ২২ বিঘার জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই নার্সারিটিতে কয়েকশ প্রজাতির লক্ষাধিক গাছের চারা রয়েছে।
মোহাম্মদ আলীর ছোট ছেলে আনোয়ারুল ইসলাম জানান, তাদের নার্সারিটির নাম ‘পুরাতন নার্সারি’। এলাকার প্রথম নার্সারি বলে এটিকে বেশির ভাগ মানুষ পুরাতন নার্সারি বলে চেনেন ও এই নামেই ডাকেন। আর তার থেকেই এটির নামও হয়ে গেছে পুরাতন নার্সারি। কাগজ কলমেও এটির নাম পুরাতন নার্সারি। তাদের এই নার্সারিটির বয়স প্রায় ৫৫ বছর। তিনি দাবি করেন, তাদেরটি খুলনা বিভাগের প্রথম নার্সারি। এমন একটা সময় ছিলো যখন খুলনাসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়িরা এসে তাদের এখান থেকে চারা সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন।
শত শত প্রজাতির চারা
দেশি প্রজাতির পাশাপাশি বিদেশি ফলের চারারও উৎপাদন হয় বাসুদেবপুরে। এখানে স্ট্রবেরি, রাম্বুটান, অ্যাভোকেডো, ড্রাগন, থাই পেয়ারসহ ৩০ থেকে ৪০ প্রজাতির বিদেশি ফলের চারা তৈরি হয়। এ ছাড়া দেশি প্রজাতির ফলের বেশির ভাগই নার্সারিগুলোয় পাওয়া যায়। এসব ফলের ‘প্যাকেট চারা’ সারা বছর জুড়ে পাওয়া যায়।
বর্ষাকালের চাক কেটে বিক্রি করা হয়। বর্ষাকালীন ৩ মাস এভাবে চারা বিক্রি হয়। প্যাকেটে রোপণ করা চারার পাশাপাশি টবে লাগানো ফুল-ফলের চারাও এখানে বিক্রি হয়। চুই, লবঙ্গ, তেজপাতা, দারুচিনি, গোল মরিচ, এলাচসহ বেশ কয়েক প্রজাতির মশলার চারার উৎপাদন ও বিক্রি হয় বাসুদেবপুরে। এসব মশলার গাছের একেকটি চারার দাম আকৃতি ভেদে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা। মশলার এই চারাগুলোর মধ্যে গোলমরিচের চারা দাম একটু বেশি। একটি চারার দাম কমপক্ষে ২৫০ টাকা। চারা উৎপাদনের জন্য ভারত থেকে মশলার বীজ আমদানি করেন নার্সারি মালিকরা।
বাড়ি বাড়ি নার্সারি পতিত নেই জমি
যশোর সদর থেকে বাসুদেবপুরের দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি। রোহিতা ইউনিয়নের ভান্ডারির মোড় থেকে খানিকটা পশ্চিমে গেলে নানান প্রজাতির গাছের চারার দৃশ্য নজর কাড়ে। রাস্তার পাশে যতদূর দৃষ্টি যায় ফুল, ফল, মশলা ও বনজের প্যাকেট চারা দেখা যায়। চলতি পথে নার্সারিগুলোয় ব্যস্ততার দৃশ্য চোখে পড়ে। নিড়ানি দিয়ে আগাছা বাছা ও ঝাঝরি দিয়ে চারায় পানি দেয়ায় ব্যস্ত সবাই। আবার কেউ ভ্যান নসিমন, ট্রাক ও পিকআপে চারা তুলে দিচ্ছেন। বাসুদেবপুরে ঢুকে পড়লে দেখা যায়, বাড়ি বাড়ি নার্সারি। বাড়ির সামনে পেছনে আশপাশে নার্সারি গড়ে তুলেছেন সবাই। সব বাড়ির সামনে নার্সারির নাম সম্বলিত সাইনবোর্ড। নানা রকমের ফুল, ফল ও মশলার চারা বাড়িগুলোর সামনে। বাড়ির ভেতরে গড়ে তোলা নার্সারিতে চলছে চারার কেনাবেচা-এমন দৃশ্যও নজর কাড়ে।
পুরাতন নার্সারি
বাসুদেবপুরের নার্সারির ব্যবসার গোড়াপত্তন হয় এই নার্সারিটি ঘিরে। নার্সারিটি ২২ বিঘার জমির ওপর। বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সংখ্যা লক্ষাধিক। নার্সারিটির সত্ত¡াধিকারীদের একজন আনোয়ারুল ইসলাম। তার বাবার হাত দিয়ে এখানে নার্সারি ব্যবসায় প্রসার ঘটে। আলাপচারিতায় তিনি জানান, বারোমাস তারা সারা দেশে চারা সরবরাহ করেন। তবে বর্ষা মৌসুমে বেচাবিক্রি বেশি হয়। তিনি জানান, গত বছর ৪২ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুম বাদেই সারা বছরে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার চারা বিক্রি করে থাকেন।
বাসুদেবপুরের নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান জানান, সারা গ্রামে ৩৬৫টিরও বেশি নার্সারি রয়েছে। এছাড়াও প্রত্যেক বাড়ির উঠোনো চারা আবাদ করেন সবাই। তিনি বলেন, ছোট নার্সারিগুলোতে স্বাভাবিকভাবে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার টাকার বিক্রি হয়। বড়গুলোর বিক্রির পরিামাণ আরো অনেকগুণ বেশি। প্রতিবছর চারা বিক্রি থেকে বাসুদেবপুরে ১০ কোটি টাকার ওপর আর্থিক লেনদেন হয়।
তিনি বলেন, নার্সারি চারা উৎপাদন করে না এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন বাসুদেবপুরে। বাড়িতে যার দুই কাঠা জমি রয়েছে নার্সারি করে লাভবান তারাও। নার্সারি ব্যবসায় এখন পাশের গ্রাম পলাশী ও চন্দ্রপুর ও হরিহর নদী পেরিয়ে পট্টি গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে।
মাহাবুবুর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুমে ৩৫ থেকে ৪০ ট্রাক লিচুর চারা যায় দিনাজপুরে। সারা দেশের মানুষ যে লিচু খায় সেই চারা বাসুদেবপুর থেকে যায়। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ লিচুর চারা বাসুদেবপুরের নার্সারি থেকে উৎপাদন হয়।
নার্সারিতে নারীদের কর্মসংস্থান
গ্রামটির নার্সারিগুলোয় পুরুষদের মতো নারীদেরও কর্ম সংস্থান হয়েছে। ঘরগৃহস্থালীর কাজের ফাঁকে যখন ফুরসত মেলে নারীরা তখন নার্সারিতে কাজ করেন। এক্ষেত্রে নারীদের চারার প্যাকেটে মাটি ভরার কাজে লাগানো হয়। এখানকার নার্সাারিগুলোয় বিভিন্ন আকৃতির পলিথিন ব্যাগে মাটি ভর্তি করে রকমারি সব প্রজাতির গাছের চারা লাগিয়ে সংগ্রহে রাখা হয়। এভাবে সংগৃহীত চারা বাসুদেবপুরে ‘প্যাকেট চারা’ নামে পরিচিত।
আলাপচারিতায় রমেছা বেগম নামে এক নারী বলেন, আকৃতি ভেদে একশ’ প্যাকেট মাটি ভরলে ৬০ থেকে ৮০ টাকা মজুরি পান। প্রতিদিন ৪ থেকে ৫শ’ প্যাকেট মাটি ভরে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। বাড়ির ছেলে-মেয়েরাও স্কুল থেকে ফিরে এসে একাজে তাদের সাথে হাত লাগায়।