নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরের ভবদহে স্থায়ী সমাধানের দাবিতে পদযাত্রা করেছে জলমগ্ন এলাকার বাসিন্দারা। সোমবার বিকালে অভয়নগর উপজেলা চত্বর থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে শেষ হয় আমডাঙ্গা খাল পর্যন্ত। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আয়োজনে সহ্রাধিক মানুষ এতে অংশ নেয়। তাদের অনেকের হাতে ছিল বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’, ‘বিলে বিলে টিআরএম চালু করো’, ‘এলাকার সকল নদী ও খাল পুনরুদ্ধার ও অবমুক্ত করো’, ‘অপরিকল্পিত ঘের নয়, পানিপ্রবাহে সকল বাধা উচ্ছেদ করতে হবে’, ‘আমডাঙ্গা খাল সংস্কার করো’ ইত্যাদি। পদযাত্রা শেষে আলমডাঙ্গা খালের পাশে এক সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক গাজী আবদুল হামিদ। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, উপদেষ্টা তসলিমুর রহমান, সদস্য সচিব চৈতন্য কুমার পাল, সংগঠনের সদস্য শিবপদ মন্ডল প্রমুখ। এসময় বক্তারা বলেন, চার দশকের বেশি সময় ধরে পালাক্রমে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে আসছে। ওই জনপদের মানুষের উদ্ভাবিত নদী, পলি ও পানিব্যবস্থার অষ্টমাসী বাঁধপ্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে ষাটের দশকে আরোপিত কর্ডন পলিসি এর জন্য দায়ী। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও তা অপচয় শুধু নয়, প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস ও জনপদের স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনছে। ভবদহ সংগ্রাম কমিটির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক গাজী আবদুল হামিদ বলেন, বর্ষা মৌসুম শেষ হয়েছে দেড় মাস আগে। তার পরেও শত শত গ্রাম এখনো জলাবদ্ধ। দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তির শিকার হয়ে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই দুর্ভোগ অব্যাহত থাকলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। দুর্ভোগ কমাতে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী সংস্কার কাজ চলমান থাকলেও টিআরএম চালু না হওয়ায় সে টাকা অপচয় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদী খননের পর পলি জমে তা দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিয়ের (আইডব্লিউএম) প্রস্তাবনা অনুযায়ী মাঘীপূর্ণিমার আগে (আগামী চার মাসের মধ্যে) একটি বিলে টিআরএম চালু না করা গেলে এবং আমডাঙ্গা খাল দ্রুত প্রশস্ত ও খনন না করা হলে এই জনপদের দুর্ভোগ কাটবে না। ভবদহ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে রয়েছেন উল্লেখ করে ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন সমস্যা সমাধানে এখনই টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট-জোয়ারাধার) চালু করতে হবে। তা না হলে নদী পুনঃখননের প্রায় ১৪০ কোটি টাকা পুরোটাই অপচয় হবে। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভবদহ পরিদর্শনের আহ্বান জানানো হলেও এক মাসেও দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। নদী-খাল থেকে কচুরিপানা, নেট-পাটা ও কৃত্রিম বাঁধ অপসারণ, ভবদহের ২১-ভেন্ট স্লুইচগেটের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং টেকা নদীর অবশিষ্ট অংশ দ্রুত খননসহ বিভিন্ন জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানায়। একই সাথে ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর টিআরএমবিরোধীদের চক্রান্তে পানিবন্দী মানুষের আন্দোলন কর্মসূচিতে তৎকালীন পুলিশের হামলা ও নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। প্রসঙ্গত, যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলার নিম্নাঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে এই ভবদহ অঞ্চল। অভয়নগরের ভবানীপুর গ্রামে শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয়। পলি পড়ে এলাকার পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় বৃষ্টির পানিতে এলাকার বিলগুলো উপচে গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে। অথচ ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে গত চার দশকে নেওয়া হয়েছে ২১টিরও বেশি প্রকল্প। খাল খনন, নদী সংস্কার, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়েছে হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই দুর্ভোগ অব্যাহত থাকলেও হয়নি স্থায়ী সমাধান। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের দাবিতে ২০১৬ সাল থেকে ৫ অক্টোবর ভবদহ দিবস পালন করছে জলমগ্ন মানুষেরা।