Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

❒ আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস

নিঃস্বার্থভাবে সড়কের দুই ধারে সবুজের বিপ্লব ঘটাচ্ছেন কলেজ শিক্ষক সফিয়ার

এখন সময়: শনিবার, ১৭ অক্টোবর , ২০২৬, ০২:১৪:১৩ এম
নিঃস্বার্থভাবে সড়কের দুই ধারে সবুজের  বিপ্লব ঘটাচ্ছেন কলেজ শিক্ষক সফিয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম মদনপুর। গ্রামটির বটতলা মোড় থেকে দক্ষিণ দিকের পিচঢালা পথ এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে মাঠের পর মাঠ। এই মাঠের বুক চিরে যে পিচঢালা পথ, সেটি গিয়ে মিশেছে রাজগঞ্জ বাজারে। এই সড়কের দুধারে সারি সারি যতদূর চোখ যাবে দেখা মিলবে ছোটবড় তালগাছ। গাছগুলো লাগিয়েছেন সফিয়ার রহমান। তিনি মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান ছাড়াই, সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এভাবে রাস্তার পাশে, রেললাইনের ধারে, নদীর তীরে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে গাছ লাগিয়ে চলেছেন এই শিক্ষক। এলাকায় তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ‘গাছপাগল শিক্ষক’ হিসেবে। জানালেন, কিছু পাওয়ার জন্য নয়; বরং সড়কের ক্ষতি ঠেকানো, বজ্রপাত থেকে রক্ষা, সৌন্দর্য বাড়ানো ও দুর্ঘটনা রোধে গাছগুলো লাগিয়েছেন। # শুরুর দিনগুলো সফিয়ার রহমানের সবুজযাত্রার শুরু নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯১ সালে তিনি ঝিকরগাছার পারবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। সে সময় সরকার দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বারবাকপুর বিলপাড়ের রাস্তার ধারে অসংখ্য শিশুগাছ ও জামগাছের চারা রোপণ করেন। সময়ের ব্যবধানে অনেক গাছ হারিয়ে গেলেও কয়েকটি জামগাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে, যেন সেই উদ্যোগের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে। ১৯৯৬ সালে তিনি মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজে যোগ দেন। এরপর নিজের এলাকা এবং আশপাশের জনপদে গাছ লাগানোর কাজ আরও বিস্তৃত করেন। তবে তার চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ হয় ২০১৪ সালের দিকে। মনিরামপুরের খর্দ গ্রামের রুহুল গাজীর সঙ্গে সাংবাদিক রুকুনউদ্দৌলা ও শাহাদত হোসেন কবিলের মাধ্যমে পরিচয়ের পর তিনি নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হন। রুহুল গাজী লাঙল চাষ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কপোতাক্ষ নদের তীরে তালগাছের আঁটি বপন করতেন। একজন সাধারণ কৃষকের এই অসাধারণ উদ্যোগ সফিয়ার রহমানকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি ভাবতে শুরু করেন, একজন কৃষক যদি প্রকৃতির জন্য এতটা দায়িত্বশীল হতে পারেন, তবে একজন শিক্ষক হিসেবে তারও আরও বড় ভূমিকা রাখা উচিত। এরপর শুরু হয় তালগাছ ও খেজুরগাছ রোপণের বিশেষ উদ্যোগ। কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় ১০০টি তালের আঁটি বপন করেন। বর্তমানে সেই আঁটি থেকে জন্ম নেওয়া ২৫ থেকে ৩০টি তালগাছ রাস্তার ধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বারো বছর পর গাছে ফলও ধরেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার সেই ‘এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ’ যেন বাস্তবে রূপ পেয়েছে তার হাতে। গত এক যুগে সফিয়ার রহমানের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বিস্ময় জাগানোর মতো। তার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের দিকে ঝিকরগাছা-রাজগঞ্জ সড়কে তিনি আম, জাম, কাঁঠালসহ প্রায় ১০ হাজার তালের আঁটি বপন করেন। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার গাছ এখনো বেঁচে আছে। মনিরামপুরের খড়িঞ্চা-রাজগঞ্জ সড়কে দুই বছরে প্রায় দুই হাজার খেজুরগাছ রোপণ করেছেন। এছাড়া শৈলি, বসন্তপুর ও তেঁতুলিয়া সড়কে প্রায় ১০ হাজার দেবদারুর আঁটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। পুলেরহাট-রাজগঞ্জ সড়কে প্রশাসনের উদ্যোগে রোপণ করা গাছ নষ্ট হয়ে গেলে বা ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে তিনি আবার নতুন করে সেখানে তালের আঁটি বপন করেছেন। শুধু রাস্তার ধারে নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও সবুজে ঘিরে রাখতে কাজ করে চলেছেন তিনি। মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজ এলাকায় লাগিয়েছেন ৩০ থেকে ৩৫টি তালগাছ, বটবৃক্ষসহ নানা প্রজাতির গাছ। কলেজ ক্যাম্পাসে লাগানো একটি বটগাছের নাম দিয়েছেন ‘জ্ঞানবৃক্ষ’। যশোর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিএড অধ্যয়নকালে তার নেতৃত্বে ২০টি পেয়ারা গাছও রোপণ করা হয়েছিল। তবে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিবেশ রক্ষার চেতনা ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে। যদিও বর্তমানে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাছ লাগানোর আগ্রহ কিছুটা কমে গেছে বলে তিনি মনে করেন, তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। এখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি মদনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ৩০ কেজি খেজুরের আঁটি সংগ্রহ করেছেন। পরে সেগুলো বসন্তপুর, দিঘিরপাড়, তেঁতুলিয়া মোড় হয়ে খাটুরা বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় বপন করা হয়েছে। সফিয়ার রহমান স্বপ্ন দেখেন বেনাপোল থেকে মংলা পর্যন্ত রেললাইনের ধারে খেজুরগাছের সারি। সেই লক্ষে সম্প্রতি বেনাপোল থেকে মংলাগামি ট্রেনে চড়ে রেললাইনের দুপাশে ছিটিয়েছেন কয়েক লক্ষ খেজুর গাছের বিচি। শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে খেজুর বিচি ছড়ানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে প্রশংসায় ভাসেন তিনি। দীর্ঘ সময় তার এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতা নেই। অধিকাংশ ব্যয়ই বহন করেছেন নিজের পকেট থেকে। তবে কখনো কখনো কিছু শুভানুধ্যায়ী পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমেরিকা প্রবাসী আবিদুর রহমান চারা সংগ্রহ ও রোপণে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। আশরাফ ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন ৪১টি কৃষ্ণচূড়া গাছ কিনে দিয়েছিল। সেসব গাছের কয়েকটি আজও কলেজ এলাকার সৌন্দর্য বাড়িয়ে চলেছে। সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন সফিয়ার রহমান। তাই শিক্ষকতার পাশাপাশি নিরবে-নিভৃতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে পরিবেশ রক্ষার এক নীরব আন্দোলন গড়ে তুলেছেন এই গাছপ্রেমী মানুষটি। গাছে পাখি এসে ফল খেলে কিংবা মানুষ গাছের নিচে বিশ্রাম নিলে তার ভালো লাগে। তার বিশ্বাস, প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে মানুষকে বৃক্ষের প্রতি ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে হবে। নিজের কাজের সার্থকতা নিয়ে তিনি বলেন, আমার দেখাদেখি একজন মানুষও যদি একটি গাছ লাগান এবং তার যত্ন নেন, তাহলেই আমার এই দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হবে। মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. সফিকুল ইসলাম জানান, ‘একজন ব্যতিক্রম শিক্ষক সফিয়ার। শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেন আনন্দের সঙ্গে। কখনো কখনো তার লাগানো গাছের নিচেও পাঠদান করার তিনি। এমন কাজের প্রশংসা করে বলেন, পরিবেশ রক্ষায় সফিয়ারের মতো অন্যদেরও এগিয়ে আসা উচিত।’

Ad for sale 100 x 870 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 225 x 270 Position (4)
Position (4)