যবিপ্রবি প্রতিনিধি : ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকদের জমিতে প্রয়োগ করা হয়েছে ন্যানো ইউরিয়া সার। এর আগে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) গবেষণা প্রকল্পে পরীক্ষামূলক প্রয়োগে সফলতা পাওয়া যায় এই ন্যানো সারের। এতে দেখা যায়, সাধারণ ইউরিয়া সারের তুলনায় ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত খরচ সাশ্রয়ী এই ন্যানো ইউরিয়া সার। জমিতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সুষমভাবে প্রয়োগের ফলে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ার সাথে সাথে সময়, শ্রম ও খরচ অনেকাংশে কমে আসবে বলে দাবি করেন গবেষকরা।
জানা যায়, ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে সর্বপ্রথম ন্যানো ইউরিয়া সার উৎপাদন করেন অধ্যাপক ড. মোঃ জাবেদ হোসেন খান। প্রথমে গবেষণা প্রকল্পের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে এ সার প্রয়োগে সফলতা পান তিনি। পরবর্তীতে যশোর সদরের চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের জগহাটি গ্রামের কৃষকদের ২৫০ বিঘা ধানের জমিতে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। এ সার প্রয়োজন অনুসারে প্রতিনিয়ত ব্যবহারের জন্যও দেয়া হচ্ছে বলে জানান কৃষকরা।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার করেছেন তারা। সোমবার (৩০ মার্চ) বিকেল ৪ টার দিকে ন্যানো ইউরিয়া সারের উদ্ভাবক ও যবিপ্রবির নেইম ল্যাবের প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মোঃ জাবেদ হোসেন খানের সভাপতিত্বে এবং বাংলাদেশ উইগ্রো টেকনোলজিস লিমিটেডের সহায়তায় কয়েকটি ধানের জমিতে ড্রোন-ভিত্তিক সার প্রয়োগের এ কার্যক্রমের মাঠ পরীক্ষার আয়োজন করা হয়।
উইগ্রো টেকনোলজিস লিমিটেডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এটি শুধুমাত্র উৎপাদনশীলতাই বাড়াবে না, বরং কৃষকদের জন্য কৃষি খরচ ও সময় সাশ্রয়ের এক দিগন্ত উন্মোচিত হবে। বাংলাদেশের কৃষি খাতে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার কৃষকদের জন্য এক নতুন যাত্রার সূচনা করবে। কৃষি জমিতে ড্রোনভিত্তিক ইউরিয়া প্রয়োগ উইগ্রোর একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যা দেশের কৃষকদের জন্য লাস্ট-মাইল সেবা নিশ্চিত করবে।
ন্যানো ইউরিয়া সারের উদ্ভাবক ড. মোঃ জাবেদ হোসেন খান বলেন, বর্তমানে ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের প্রচুর সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার যদি দেশে ন্যানো ইউরিয়া উৎপাদনের অনুমতি দেয়, তবে আমাদের হাজার কোটি টাকার ইউরিয়া সাশ্রয় হবে বলে আমরা মনে করি।
আমিনুর রহমান নামে এক চাষি বলেন, কৃষকরা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। আমরা কয়েকজন ন্যানো ইউরিয়া সার ব্যবহার করেছি। আমি সাধারণ ইউরিয়া ও ন্যানো ইউরিয়া দুটি দিয়ে ধানের আবাদ করেছি। তবে ন্যানো ইউরিয়া দেয়া জমির ধানটি বেশি ভালো হয়েছে। সাধারণ ইউরিয়া দেওয়া জমিতে ধান গাছে অতিরিক্ত পাতা হয়েছে, গাছে কোনো শক্তি নেই। তা ছাড়া ধানের পরিমাণ কম।
জাকির আলী নামে অপর এক কৃষক বলেন- ন্যানো ইউরিয়া দেয়া জমির ধান গাছগুলো একটু ছোট এবং গাছের পাতা কম। সেইসঙ্গে প্রচুর ধান। সাধারণ ইউরিয়া সারের জমিতে বিঘায় ২২ মণ ধান হলে ন্যানো ইউরিয়া দেয়া জমিতে বিঘায় ২৫/২৬ মণ ধান হবে বলে আশা করছি। কোনো সরকার সরাসরি বা কোম্পানি দিয়ে এ সার বাজারজাত করলে আমরা কৃষকরা লাভবান হবো।
উইগ্রো টেকনোলজিস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন- কৃষিতে সুনির্দিষ্টতা, দক্ষতা এবং টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও), আইওটি (ওড়ঞ), ড্রোন প্রযুক্তি, সয়েল সেন্সর এবং উদ্ভাবনী কৃষি যন্ত্রপাতির পরীক্ষামূলক ব্যবহার ও এর বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা জাবেদ স্যারের এ অসাধারণ আবিষ্কারের সাথে আমাদের ড্রোন প্রযুক্তি যুক্ত করে বাংলাদেশের কৃষিতে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চাই।
এ আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ মোশাররফ হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন গাজীপুরের এফএমপিই বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ এরশাদুল হক ও যশোর সদর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসার মোসাঃ রাজিয়া সুলতানা। এছাড়াও উইগ্রোর পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান এবং হেড অব বিজনেস এক্সপ্যানশন অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি শাকিল আহমেদ শুভ।
প্রসঙ্গত, উইগ্রো টেকনোলজিস লিমিটেড বাংলাদেশের কৃষিখাতের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি সংযোজনে নিবেদিত একটি এগ্রি-টেক ও কৃষি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, যা সারাদেশে ৩০,০০০-এর অধিক প্রান্তিক কৃষক ও তরুণ কৃষি উদ্যোক্তার সাথে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।