বিল্লাল হোসেন : ঢাকায় শরিফ ওসমান হাদিকে যেভাবে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে পেছন দিক লক্ষ্য করে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল যশোরের আলমগীর হত্যাকাণ্ড সেই একই নকশার প্রতিচ্ছবি। তার দুই দিন পর গুলি করে হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে। দুই দিনের ব্যবধানে খুন হওয়া দুজনকেই মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যা মিশন সফল করতে খুনিরা ব্যবহার করেছে মোটরসাইকেল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনসম্মুখে মাথায় গুলি করে হত্যার ঘটনা কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুটি হত্যাকান্ডে পেশাদার কিলার অংশ নিয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর যশোরের শীর্ষ সন্ত্রাসী রমজান শেখের ভাই ১৯ মামলার আসামি সাগর শেখ হত্যার শিকার হন। খুলনার রুপসার জাপুসা চৌরাস্তায় দুর্বৃত্তরা তার মাথায় গুলি করে হত্যা করে। ঢাকায় শরিফ ওসমান হাদিকে যেভাবে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে পেছন দিক লক্ষ্য করে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল যশোরের আলমগীর হত্যাকাণ্ড সেই একই নকশার প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠিত ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং মেথড’ যেখানে খুনিরা জানে প্রকাশ্যে খুন করেও তারা দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারে। গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যশোর শহরের শংকরপুর ইসহাক সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে যেভাবে হত্যা করা হয়, তা নিছক ব্যক্তিগত শত্রুতার ইঙ্গিত দেয় না। তিনি যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি এলাকায় ভূমি ব্যবসায়ী ও দানবীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী বা অপরাধমূলক অভিযোগ নেই বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সচেতন মহলের অভিমত, এই হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে প্রশ্ন উঠছে, খুনিরা কি আদৌ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভয় পায়? শহরের ব্যস্ত সড়কে, সন্ধ্যার সময়ে, মোটরসাইকেল ব্যবহার করে মাথায় গুলি-সবকিছুই পরিকল্পিত এবং বার্তাবাহী। এটি যেন কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক শক্তিকে সতর্ক করে দেয়ার কৌশল। আলমগীর হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মণিরামপুরের কপালিয়া বাজারে রানা প্রতাপ বৈরাগীকে একইভাবে হত্যা করা হয়। মাথা লক্ষ্য করে একাধিক গুলি, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু, দুর্বৃত্তদের নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়া-সব মিলিয়ে দৃশ্যপট প্রায় অভিন্ন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সাতটি গুলির খোসা উদ্ধার করলেও হত্যার পেছনের প্রকৃত নেটওয়ার্ক এখনো অজানা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রানা প্রতাপ একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে এটিকে প্রতিপক্ষের প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখানোর চেষ্টা থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়, একই সময়ে, একই জেলায়, একই কায়দায় পরপর দুটি হত্যা কি নিছক কাকতালীয়? আলমগীর ও রানা প্রতাপ-দুজনের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় আলাদা হলেও হত্যার কায়দা এক। এই মিলই সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়, হাদি স্টাইলে হত্যার মিশন কি তাহলে আরও দীর্ঘ হচ্ছে? মণিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রজিউল্লাহ খান জানান, রানা প্রতাপ বৈরাগীকে (৪২) গুলি করে হত্যায় ঘটনায় তিনটি দিক সামনে রেখে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। কারণগুলো হলো নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি দল ছেড়ে দেয়ার জের, পেশাগত দ্বন্দ্ব ও ব্যবসায়িক শত্রুতা।খুব শিগগির হত্যার মোটিভ উদঘাটন হবে। খুনিদের আটক করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গাড়াপোতা- ভাষণপোতা গ্রামের মাঝে মাঠের রাস্তায় মতিয়ার রহমান মন্ডল (৫৬) নামে এক বিএনপি সমর্থক গুলিবিদ্ধ হন। তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে ভৈরবার দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে এসে পিছন থেকে তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। মতিয়ার মন্ডল উপজেলার বাগডাঙ্গা গ্রামের মৃত আজিজুর রহমানের ছেলে। তাকে গুরুতর অবস্থায় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ডাক্তার তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। বিএনপির খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, অতীতে যশোরে বিএনপির অন্তত ৬৮ জন নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। সরকার পরিবর্তনের পরও যদি একই কায়দায় হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে, তবে প্রশ্ন উঠবেই-রাষ্ট্রীয় কাঠামো কি আদৌ বদলেছে, নাকি কেবল ক্ষমতার মুখ বদলেছে? প্রকাশ্যে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য কেবল একজন ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং পুরো সমাজে ভয় ছড়িয়ে দেয়া। যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, পারিবারিক দ্বন্দ্বে আপন মেয়ে জামাইয়ের পরশের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে খুন করেছে। নিহতের জামাই পরশসহ দুইজনকে আটক করা হয়েছে। হত্যার মিশনে অংশ নেয়া খুনিদের আটকে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তায় পুলিশ সর্বদা সোচ্চার। এদিকে, ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০ টার দিকে রুপসার জাপুসা চৌরাস্তায় দুর্বৃত্তরা সাগর শেখকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়ে। একটি গুলি তার মাথায় ও আরেকটি হাঁটুতে লাগে। এতে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। । সাগর শেখ যশোর শহরের রেলগেট পশ্চিম পাড়ার ফয়েজ আলী শেখের ছেলে। তার ভাই রমজান খুন হওয়ার পর সাগর খুলনায় আত্মগোপনে ছিলেন। তার খুনের কারণ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। খুনের মোটিভ উদঘাটনে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান রুপসা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক মীর।