শোকে স্তব্ধ বেইলি রোড : আগুনে মৃত্যু ৪৬, হাসপাতালে ১২

এখন সময়: শনিবার, ২০ এপ্রিল , ২০২৪, ১১:১৪:২০ এম

স্পন্দন ডেস্ক : এমন লিপ ইয়ারের দিন কি কেউ কল্পনা করেছিলেন? নিমিষেই আলো ঝলমলে বেইলি রোড রূপ নেবে মৃত্যুপুরিতে! লিপ ইয়ারের দিন অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখ থাকায় দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে অনেকেই পরিবার-প্রিয়জনের নিয়ে সময় কাটাতে জড়ো হয়েছিলেন রেস্টুরেন্ট ও কাপড়ের শো-রুম ভরা ভবনটিতে।
সাপ্তাহিক ছুটির আগের রাতে বৃহস্পতিবার বেইলি রোডের এ অংশের খাবার দোকানগুলোতে বরাবরই ভিড় থাকে। ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতও ছিল অন্য এক রাতের মতই। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর খাবারের স্বাদ নিতে কিংবা স্বজনদের সঙ্গে খাবার আনন্দ ভাগ করতে তারা এসেছিলেন ছোট ছোট দলে। সেই আনন্দ আয়োজন এক আগুনে পরিণত বিষাদপুরীতে।
রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ জনের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ১২ জন। জীবিত উদ্ধার হয়েছে ৭৫ জন। বেইলি রোড ট্র্যাজেডি ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গেছে আলো ঝলমল গোটা এলাকা।
শুক্রবার সকালে ১০টায় ঢাকা মেডিকেল ও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট পরিদর্শন করে মৃতের সংখ্যা বাড়ার তথ্য দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন।
বার্ন ইউনিটের সামনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “ বৃহস্পতিবার রাতে বেইলি রোডে একটা অত্যন্ত মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
মন্ত্রী বলেন, “যারা মারা গেছেন তারাও কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিংয়ের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ, একটা বদ্ধ ঘরে যখন বের হতে পারে না, তখন ধোঁয়াটা শ্বাসনালীতে চলে যায়। প্রত্যেকেরই তা হয়েছে।
“যাদের বেশি হয়েছে, তারা মারা গেছেন। তবে যারা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, তারা কেউ শঙ্কামুক্ত নয়।”
রাজধানীর বেইলি রোডে ভবনে আগুনের ঘটনায় মৃতদের পরিচয় শনাক্তের পর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। ৪৬ মরদেহের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত করা হয় ৪১টির। এরমধ্যে ৩৯ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া বাকি ছয় জনের মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) মর্গে রাখা হয়েছে।
যাদের শনাক্ত করা হয়েছে তারা হলেন
১. ফৌজিয়া আফরিন রিয়া (২২), পিতা: কুরবান আলী; কাকরাইল, ঢাকা।
২. পপি রায় (৩৬), পিতা: প্রলেনাথ রায়, মা: বাসনা রানী রায়; ২১৬ মালিবাগ, শান্তিবাগ, ঢাকা। ৩. সম্পনা পোদ্দার (১১), পিতা: শিপন পোদ্দার, মা: পপি রায়; সূত্রাপুর, দয়াগঞ্জ, ঢাকা।
৪. আশরাফুল ইসলাম আসিফ (২৫), পিতা: মৃত জহিরুল ইসলাম; উত্তর গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা। গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা।
৫. নাজিয়া আক্তার (৩১), পিতা: মোহাম্মদ আলী, মা: নাজনীন আক্তার বেবি; ১৪ আরামবাগ, ঢাকা।
৬. আরহাম মোস্তফা আহামেদ (৬), পিতা: আশিক, মা: নাজিয়া আক্তার; ১৪ আরামবাগ, ঢাকা।
৭. নুরুল ইসলাম (৩২), পিতা: মুসলেম; বংশাল, বেচারাম দেউড়ি, ঢাকা।
৮. সম্পা সাহা (৪৬), পিতা: জয়ন্ত কুমার পোদ্দার; নবীপুর, মুরাদনগর, কুমিল্লা।
৯. শান্ত হোসেন (২৪), পিতা: আমজাদ হোসেন, নারায়ণগঞ্জ, ফতুল্লা।
১০. মায়শা কবির মাহি (২১), পিতা: কবির খান, (তাৎক্ষণিকভাবে ঠিকানা জানা যায়নি)এ
১১. মেহেরা কবির দোলা (২৯), পিতা: কবির খান, মতিঝিল এজিবি কলোনি, ঢাকা।
১২. জান্নাতি তাজরিন নিকিতা (২৩), পিতা: গোলাম মহিউদ্দিন; আর্কিট হাউজ, শান্তিনগর, কাকরাইল। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
১৩. লুৎফুর নাহার করিম (৫০), মা: জহুরা ইসলাম; রমনা সার্কিট হাউজ, ঢাকা। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষিকা।
১৪. মোহাম্মদ জিহাদ (২২), পিতা: জাকির হোসেন; পূর্বচর আলিমবাগ, কালকিনি, মাদারীপুর।
১৫. কামরুল হাসান (২০), পিতা: কবির হাসান; যশোর সদর উপজেলার মধ্যপাড়া।
১৬. দিদারুল হক (২৩), পিতা: মাইনুল হক; উত্তর পাড়া, ভোলা সদর।
১৭. অ্যাড. আতাউর রহমান শামীম (৬৫), পিতা: ফজলুল রহমান; কুলাউড়া, মৌলভীবাজার। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতা।
১৮. মেহেদী হাসান (২৭), পিতা: মোয়াজ্জেম মিয়া; মির্জাপুর, টাঙ্গাইল।
১৯. নুসরাত জাহান শিমু (১৯), পিতা: আব্দুল কুদ্দুস; হাতিগাড়া, কুমিল্লা সদর, কুমিল্লা।
২০. সৈয়দা ফাতেমা তুজ জোহরা (১৬), পিতা: সৈয়দ মোবারক কাউসার; ৩৭৭ মগবাজার, মধুবাগ, ঢাকা। গ্রামের বাড়ি শাহবাজপুর, কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। একই পরিবারের পাঁচ জন নিহত।
২১. সৈয়দ আব্দুল্লাহ (৮), সৈয়দ মোবারক কাউসার (ভাই)। (তাৎক্ষণিকভাবে ঠিকানা জানা যায়নি)।
২২. স্বপ্না আক্তার (৪০), আব্দুল্লাহর মা। (তাৎক্ষণিকভাবে ঠিকানা জানা যায়নি)।
২৩. সৈয়দ মোবারক কাউসার (৪৮), পিতা: সৈয়দ আবুল কাশেম; ইতালি প্রবাসী ছিলেন।
২৪. সৈয়দা আমেনা আক্তার নুর (১৩), সৈয়দ মোবারক কাওসার। শাহাবাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বাবা ইতালি প্রবাসী ছিলেন।
২৫. জারিন তাসনিম প্রিয়তি (২০), পিতা: আওলাদ হোসেন; বিনোদপুর, মুন্সিগঞ্জ সদর।
২৫. জুলেল গাজী (৩০), পিতা: ইসমাইল গাজী; গুলশান মডেল টাউন, বাড্ডা, ঢাকা।
২৬. প্রিয়াংকা রায় (১৮), পিতা: উত্তম কুমার রায়, মা: রুবিয়া রায়। ১৩৪, মালিবাগ প্রথম লেন, শাহজাহানপুর।
২৭. রুবি রায় (৪৮), স্বামী: উত্তম কুমার রায়।
২৮. তুষার হাওলাদার (২৩), পিতা: দিনেশ চন্দ্র হাওলাদার; ঝালকাঠি, কাঠালিয়া উপজেলার তালগাছিয়া। বর্তমানে খিলগাঁওর গোড়ানে বসবাস করতেন। চাকরি করতেন একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে।
২৯. কে এম মিনহাজ উদ্দিন (২৫), পিতা: ওয়ালিউল্লাহ খান, চাঁদপুর সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রাম। তিন ভাই। বর্তমানে মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় থাকতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন, একটি আইটি ফার্মে চাকরি করতেন।
৩০. সাগর (২৪), পিতা: তালেব প্রামাণিক, জেলা: ফরিদপুর। সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করতেন।
বার্ন ইনস্টিটিউটে রাখা ১০ মরদেহের পরিচয়:
৩১. তানজিলা নওরিন (৩৫), পিতা: নুরুল আলম, পিরোজপুর সদর।
৩২. শিপন (২১), পিতা: ফজর আলী, শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার কালারচর।
৩৩. আলিসা (১৩), পিতা: ফোরকান; কালারচর, রমনা, ১০৪ কাকরাইল।
৩৪. নাহিয়ান আমিন (১৯), পিতা: রিয়াজুল আমিন, বরিশাল সদর কাউনিয়া। বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র।
৩৫. সংকল্প সান (৮), পিতা: শিপন পোদ্দার, যাত্রাবাড়ী, ২৬/সি দয়াগঞ্জ জেলেপাড়া।
৩৬. লামিশা ইসলাম (২০), পিতা: নাসিরুল ইসলাম, রমনা, মালিবাগ। পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজির মেয়ে।
৩৭. মো. নাঈম (১৮), পিতা: মো. নান্টু, বরগুনা।
৩৮. অভিশ্রুতি শাস্ত্রী (২৫), দা রিপোর্ট ডটকম নিউজপোর্টালের রিপোর্টার।
৩৯. আসিফ (২৫), পিতা: আবুল খায়ের. সেনাবাগ নোয়াখালী।
বার্ন ইনস্টিটিউট ও ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি যারা
বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন—ফয়সাল আহমেদ (৩৮), সুজন মÐল (২৪), প্রহিত (২৫), আবিনা (২৩), রাকিব হাসান (২৮), কাজী নাওশাদ হাসান আনান (২০), আজাদ আবরার (২৪), মেহেদী হাসান (৩৫), রাকিব (২৫) ও সুমাইয়া( ৩১)। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ইকবাল হোসেন (২৪) ও যোবায়ের (২১)।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হেদায়েতুল ইসলাম জানিয়েছেন, ৪৬টি মৃতদেহের মধ্যে ৪১টি শনাক্ত হয়েছে। ৪০ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে, রাজধানীর বেইলি রোডের বহুতল যে ভবনে আগুন লেগে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, সেটিতে রেস্তোরাঁ করার অনুমোদন ছিল না। ভবনটি শুধু অফিসকক্ষ হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
ভবনটিতে আটটি রেস্তোরাঁ, একটি জুস বার (ফলের রস বিক্রির দোকান) ও একটি চা-কফি বিক্রির দোকান ছিল। ছিল মুঠোফোন ও ইলেকট্রনিকস সরঞ্জাম এবং পোশাক বিক্রির দোকানও।
নিচতলার একটি দোকানের সিলিন্ডার থেকে বেইলি রোডে আগুনের সূত্রপাত বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এম খুরশীদ হোসেন। তিনি বলেন, দ্রæত ফায়ার সার্ভিস সেখানে পৌঁছালেও অন্যান্য সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হওয়ায় দ্রæত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে মার্কেটে একটি মাত্র সিঁড়ি থাকায় মারা যাওয়া ব্যক্তিরা নামতে পারেননি। নিচে নামতে গিয়ে অনেকে পুড়ে গেছে।
রাজউক জানিয়েছে, ভবনটির অনুমোদন আটতলার। শুধু আটতলায় আবাসিক স্থাপনার অনুমোদন আছে।
রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রকল্পের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ভবনটির এক থেকে সাততলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। তবে তা শুধু অফিসকক্ষ হিসেবে ব্যবহারের জন্য। রেস্তোরাঁ, শোরুম (বিক্রয়কেন্দ্র) বা অন্য কিছু করার জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ভবনের নিচতলায় ‘স্যামসাং’ ও ‘গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার’ নামের দুটি ইলেকট্রনিকস সরঞ্জাম বিক্রির দোকান, ‘শেখলিক’ নামের একটি জুস বার (ফলের রস বিক্রির দোকান) ও ‘চুমুক’ নামের একটি চা-কফি বিক্রির দোকান ছিল। দ্বিতীয় তলায় ‘কাচ্চি ভাই’ নামের একটি রেস্তোরাঁ, তৃতীয় তলায় ‘ইলিয়ন’ নামের একটি পোশাকের দোকান, চতুর্থ তলায় ‘খানাস’ ও ‘ফুকো’ নামের দুটি রেস্তোরাঁ, পঞ্চম তলায় ‘পিৎজা ইন’ নামের একটি রেস্তোরাঁ, ষষ্ঠ তলায় ‘জেসটি’ ও ‘স্ট্রিট ওভেন’ নামের দুটি রেস্তোরাঁ এবং ছাদের একাংশে ‘অ্যামব্রোসিয়া’ নামের একটি রেস্তোরাঁ ছিল।
অবশ্য ভবনের ছবিতে সপ্তম তলায় ‘হাক্কাঢাকা’ নামের একটি রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড দেখা যায়, যা ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে আসেনি।
রাজউক যেমন বলছে, ভবনটিতে রেস্তোরাঁ বা পোশাকের দোকানের অনুমোদন ছিল না, তেমনি ফায়ার সার্ভিসও বলছে, ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তায় ঘাটতি ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বেইলি রোডে গিয়ে আজ সাংবাদিকদের বলেন, ভবনটিতে কোনো অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে ভবন কর্তৃপক্ষকে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনটিতে আগুন লাগে। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় ছিল বিরিয়ানির পরিচিত খাবার দোকান ‘কাচ্চি ভাই’ এর শাখা, পোশাকের ব্র্যান্ড ইলিয়েন, নিচের তলায় স্যামসাং এর শোরুমসহ আরও বেশ কিছু দোকান। স্যামসাংয়ের শোরুমের পাশে রয়েছে একটি কফি শপ। এরকম কফির দোকানসহ ফাস্টফুডের অনেকগুলো দোকান ও রেস্তোরাঁ রয়েছে ভবনটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে আগুন নিভিয়ে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস। এরপরই আসতে থাকে একের পর এক মৃত্যুর খবর। ২২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি ও ভবন থেকে ৭৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।