আবদুল কাদের : গত ২৬ সেপ্টেম্বর। যশোর সদরের কৃষ্ণবাটি লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে একটি ইজিবাইকের। বেনাপোল থেকে ঢাকাগামি সেই রূপসী বাংলা ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে যায় ইজিবাইকটি। এসময় ঘটনাস্থলেই মারা যান ইজিবাইক চালক আজিজুর রহমান ও যাত্রী এরশাদ আলী। গুরুত্বর আহত হয় আরোও দুইজন। স্থানীয়রা জানান, চাঁচড়া ও আরবপুর ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষ যাতায়াতে ব্যবহার করেন কৃষ্ণবাটি লেভেল ক্রসিংয়ের সড়ক। বছরের পর বছর লেভেল ক্রসিংয়ের দাবি জানালেও অরক্ষিত ক্রসিংয়ের কারণে প্রায় ঘটে দুর্ঘটনা। গত ১০ মে। অভয়নগর উপজেলার ভাঙাগেট এলাকায় ট্রেন ও ট্রাকের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভাঙাগেট এলাকায় রহমত ওয়েব্রিজের সামনে লেভেল ক্রসিং দিয়ে কয়লা বোঝাই একটি ট্রাক পার হচ্ছিল। এসময় খুলনা থেকে ছেড়ে আসা যশোরগামী মহানন্দা ট্রেন ট্রাকটিকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় আধাকিলোমিটার দূরে নিয়ে যায়। এতে ট্রাকটি দুমড়ে মুচড়ে রেললাইনের পাশে ছিটকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান চালক মনোয়ার হোসেন। এই ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণ করে দিন কাটাচ্ছে হেলপার রায়হান। এই দুটি ঘটনা নয়; বাংলাদেশ রেলওয়ে পাকশী বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলের তথ্যমতে, যশোর রেলওয়ে স্টেশন থেকে যশোর-বেনাপোল, যশোর-কোটচাঁদপুর ও যশোর খুলনা রুটের যশোর অংশে মোট ১৮৩টি রেলক্রসিং রয়েছে। যার মধ্যে ১০১টিই অবৈধ। আর বৈধ্য যে ৮২টি রয়েছে তার ৩৮টির নাই কোন গেটম্যান। দুর্ঘটনা ঝুঁকি এড়াতে নামকায়াস্তে সর্তকর্তা সাইনবোর্ড বসালেও; বেশির ভাগ বোর্ড লেখা অস্পৃষ্ট আর নাজুক। অরক্ষিত ক্রসিংয়ে গেটম্যান না থাকায় মাঝেমধ্যে ঘটছে দুর্ঘটনা। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দুটি দুর্ঘটনায় মারা গেছে পাঁচ জন। আর এক দশকে এই অঞ্চলে ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি। এতে প্রাণ হারিয়েছে ৭৫ জনের। আহত আর পঙ্গুত্ব হয়ে কাটছে অসহায়ত্বের জীবন অসংখ্যা মানুষের। অরক্ষিত ক্রসিং নিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। রেলকর্তৃপক্ষের দাবি, যেখানে সেখানে রাস্তা নির্মাণের ফলে বাড়ছে অনুমোদনহীন ক্রসিং। এজন্য স্থানীয়দের পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো দপ্তরের কর্মকর্তাদের দুষছেন রেল কর্তারা। তবে দায় এড়াচ্ছে এলজিইডিও। তারা বলছে, তাদের অধীনে সড়কগুলোরর রেল ক্রসিংগুলোকে গেটম্যান দিতে রেলবিভাগকে অবহিত করেও কাজে আসেনি। সরকারি এই দুই দপ্তরের সমন্বয়হীনতায় বছরের পর বছর প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ এমনটি অভিযোগ স্থানীয়দের। সরেজমিনে দেখা যায়, যশোর-বেনাপোল রেললাইনের ২৮টি রেলক্রসিং রয়েছে। এসময় স্থানে চারটি স্থান বাদে বাকি ২৪টি স্থানে গেইটবার না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে রেল লাইন পারাপার হচ্ছেন পথচারীরা। যশোর কোটচাঁদপুর রুটে খড়কিতে আধা কিলোমিটারে ভিতরে সাতটি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। সবগুলো অবৈধ। এলজিইডি সড়কগুলো নির্মাণের সময়ে এসব ক্রসিংয়ের সৃষ্টি বলে জানান স্থানীয়রা। খড়কি ধোপাপাড়ার সড়কটি যশোর পৌরসভার দক্ষিণ অংশের বড় একটি মানুষের শহরে প্রবেশদ্বার। এই সড়কের মাঝ দিয়ে চলে গেছে যশোর কোটচাঁদপুর রেলপথ। ঢাকা রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গে রেলপথের ব্যস্ততম রেলপথটি। অথচ এই ক্রসিং নেই কোন গেটম্যান। সর্তকর্তা সাইনবোর্ড থাকলেও বোর্ড লেখা অস্পৃষ্ট আর নাজুক। বুধবার সকালে যেয়ে দেখা যায়, রিকসা ইজিবাইকসহ ব্যক্তিগত যানবাহন ক্রসিং পার হচ্ছে। এরমধ্যে দিয়ে হঠাৎ করেই সাইরেন বাজিয়ে ঝিক ঝিক করে ছুঁটে যাচ্ছে ট্রেন। সাহেব আলী নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘রেললাইন পার হতে গিয়ে এখানে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। এখানে বড় একটি বাগ আছে, ফলে ট্রেন দেখা যায় না। এই স্থানটি খুবই দুর্ঘটনা প্রবণ।’ স্থানীয়রা জানান, কয়েকবার রেলবিভাগের কাছে দাবি জানালে তারা জানায় এলজিইডির কাছে যেতে। পরে তারাও একে উপরের দায় চাপিয়ে দেন। বছরের পর বছর দুর্ঘটনা ঘটলেও কোন দপ্তর আমলে নেয়নি অভিযোগ স্থানীয়দের। তপপিডাঙ্গা এলাকার ভ্যান চালক আলম জানান, ‘এই গেটে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটে। গেটম্যান না থাকায় আমরা একজন দাঁড়িয়ে গেটম্যানের দায়িত্ব পালন করি। যখন কেউ থাকে না; তখন ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটেই।’ রেলের যশোর অঞ্চলের সহকারি নির্বাহী প্রকৌশলী চাঁদ আহমেদ বলেন, ‘অবৈধ গেটগুলো ব্যবহারের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। কোথাও কোথাও এসব ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং সৃষ্টি করেছে পৌরসভা, এলজিইডি কিংবা স্থানীয়রা। সড়ক নির্মাণের আগে ও পরে আমরা এসব দপ্তরে চিঠি দিয়েও বাড়ছে এসব ঝুঁকিপূর্ণ পথ। এগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ যশোর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘২০১৮ সালে গেটম্যান দিতে রেলবিভাগকে অবহিত করা হয়। সেই চিঠির এখনো কি অবস্থা সেটা আমার জানা নেই। বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রুহুল আমিন বলেন, ‘সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে কোন সমান্বয় নেই। ফলে দিন দিন বাড়ছে অবৈধ এসব ক্রসিং। এসব ক্রসিং একেকটা মৃত্যুর ফাঁদ। দ্রুত এসব ক্রসিং বন্ধ করা কিংবা যাতাযাত নিরাপদ করতে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি মানুষদেরও সচেতন হতে হবে।’