মনিরুল ইসলাম মনি, সাতক্ষীরা : পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে লেবাননে যাওয়া সাতক্ষীরার দুই যুবক শফিকুল ইসলাম (৪০) ও নাহিদুল ইসলাম নাহিদ (২৫) ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। রোববার (১০ মে) দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়া জিদ্দিন ফোজামাল এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলার কবলে পড়েন তারা। নিহতের এই ঘটনায় পরিবারের মধ্যে এখন শুধুই আহাজারি, কান্না আর স্বজন হারানোর শোকে যেন সাতক্ষীরার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর ও আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের নিহত দুই পরিবারে মধ্যে চলছে এখন শোকের মাতম। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজন হারানো পরিবার ও এলাকাবাসী।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের হতদরিদ্র দিনমজুর আফছার আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম পরিবারের ঋণের ১০ লাখ টাকা পরিশোধ, পরিবারের সচ্ছলতা আর তার দুই মেয়ের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার স্বপ্ন নিয়ে প্রবাস জীবন শুরু করলেও মর্মান্তিক ইসরায়েলের ড্রোনের বোমা হামলায় নিমিষেই তার সেই স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে। একই হামলায় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের যুবক নাহিদুল ইসলাম নাহিদ সহ আরও এক সিরীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন লেবাননের গণমাধ্যম লরিয়েন্ট টুডে। একই সাথে লেবাননের দূতাবাসের প্রথম সচিব আনোয়ার হোসেন ও বাংলাদেশ দূতাবাস, বৈরুত এক শোকবার্তায় নিহত দুই বাংলাদেশি যুবক ও সিরীয় নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।
দূতাবাস জানায়, স্থানীয় সময় দুপুর প্রায় ১২টার দিকে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়া জিদ্দীন ফোজামাল এলাকায় একটি পাউরুটি বাহি গাড়িতে ওঠার সময় ড্রোন হামলায় নিহত হন তারা। একই দাবি করা হয়েছে নিহত দুই প্রবাসী বাংলাদেশী যুবকের পরিবারের পক্ষ থেকে। বর্তমানে তাদের মরদেহ নাবাতিহের নাবিহ বেররী হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই নিহত শফিকুল ইসলামের ভালুকা চাঁদপুরের বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, ও নিহত শফিকুল ইসলামের মেয়ের স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী, অধ্যক্ষ ও গণমাধ্যমকর্মীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব পাল, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মিজান চৌধুরী সহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা নিহত পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়।
নিহত শফিকুল ইসলামের স্ত্রী রুমা খাতুন জানান, গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে স্বামীর সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। ফোনে শফিকুল তার বড় মেয়ে কলেজ শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার মৌ এবং ছোট মেয়ে তন্নি আক্তার বৃষ্টির পড়াশোনার খোঁজ নিয়েছিলেন এবং তাদের মানুষের মতো মানুষ করার তাগিদ দিয়েছিলেন।
শফিকুল তার পরিবারকে আশ্বস্ত করেছিলেন, শিগগিরই পরিবারের ১০ লাখ টাকা ঋণ এবং তার বিদেশ যাওয়ার জন্য ৪টি এনজিও ও আত্মীয়দের কাছ থেকে নেওয়া আরও ৬ লাখ টাকার ঋণ খুব দ্রুত পরিশোধ করে দেবেন। লেবাননের যুদ্ধাবস্থা নিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, শহর এলাকায় হামলা হলেও তারা গ্রাম এলাকায় কিছুটা নিরাপদে আছেন। তবে সেই আশ্বাসের দুই দিনের মধ্যেই তার মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছায় বাড়িতে।
নিহত শফিকুল ইসলামের বাবা দিনমজুর আফসার আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য মাত্র দুই মাস আগে গত দুই রমজানে ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠাইছিলাম। সংসারে একটু সুখ আসবে বলে। এখন আমার ছেলেটা ইসরায়েলের বোমা হামলায় মৃত্যুবরণ করতে হলো। আমি আমার ছেলের মুখটা শেষবার দেখতে চাই। সরকারের কাছে আকুতি, যেন দ্রুত আমার ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনে।”
নিহত শফিকুলের ফুফাতো ভাই রফিকুল ইসলাম বলেন,“ আমার ভাই শফিকুল ইসলামের পরিবার খুবই দরিদ্র। মামার বাড়ির মাত্র তিন শতক জায়গায় তারা বসবাস করে। সেখানে একটি ঘর করতে যেয়ে দশ লাখ টাকা খরচ হয় তাদের ?। ঋণ করেই মূলত সেই পাকা বাড়ি করা হয়। পরে সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তার বাবা। শফিকুল ইসলাম লেবাননের নাবাতিয়া জিদ্দিন এলাকায় বাসা বাড়িতে দরোয়ানের চাকরি করতো। এবং তাদের একটি ফলের আপেল বাগান দেখাশোনা করত। সোমবার একটি পাউরুটি গাড়িতে উঠতেই ড্রোন হামলায় সে নিহত হয়। নিহত শফিকুল ইসলামের বাবার সরকারের কাছে এখন একটাই আকুতি ছেলের লাশ ফেরতের জন্য সরকারের নিকট সার্বিক সহযোগিতা চান। বিদেশ থেকে মরদেহ আনার সামর্থ্যও তাদের নেই। তাই সরকারের উদ্যোগেই মরদেহ বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।
নিহতের বড় মেয়ে আলুকা চাঁদপুর ডিগ্রী কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী তামান্না আক্তার মৌ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“আমরা দুই বোন, আমাদের কোনো ভাই নেই। আব্বু আমাদের ভালো রাখার জন্য, পরিবারের সচ্ছলতার জন্য বিদেশে গিয়েছিল। এখন আমরা শুধু চাই, সরকার যেন দ্রুত আব্বুর লাশ দেশে আনে। শেষবার আব্বুকে দেখতে চাই।”তিনি আরও বলেন,
“ওর বাবার খুব ইচ্ছা ছিল দুই মেয়েকে ভালোভাবে বিয়ে দেবে। সেই স্বপ্নও শেষ হয়ে গেল।”
স্থানীয় ভালুকা চাঁদপুর কলেজের অধ্যক্ষ মোবাশ্বেরুল হক জ্যোতি বলেন, “শফিকুল ইসলাম একজন রেমিটেন্স যোদ্ধা। পরিবারকে সুখে রাখার আশায় প্রায় ১০ লাখ টাকা ঋণ করে মাত্র দুই মাস আগে বিদেশে গিয়ে ছিলেন। এর মধ্যেই তার মৃত্যুসংবাদ এলো। পরিবারটি অত্যন্ত অসহায়। রেমিটেন্স যোদ্ধা শফিকুল ইসলামের মরদেহ দ্রুত তার পরিবারের নিকট হস্তান্তরের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে নিহত শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত। এ সময় তিনি বলেন,“ দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়য়েলের ড্রোন হামলায় নিহত দুই প্রবাসীর লাশ দেশে আনার জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আমরা স্থানীয় প্রশাসন একটি চিঠি করে সেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসে যোগাযোগ করে তাদের মরদেহ দেশে আনার ব্যাপারে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। এজন্য নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসে লাশ ফেরত চেয়ে দরখাস্ত দেয়ার আহবান জানান তিনি।
অন্যদিকে নিহত যুবক নাহিদুল ইসলাম নাহিদের আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামেও চলছে শোকের মাতম। দুপুরে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুন্ডু তার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নেন। এবং দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যাপারে সকল ধরনের সহযোগিতার জন্য আশ্বস্ত করেন।
নিহত নাহিদুল ইসলামের বাবা আব্দুল কাদের বলেন, “আমার দুইটা ছেলে। বড় ছেলে নাহিদকে ৬ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে পাঠাইছিলাম। এখন তার লাশটা দেশে এনে যেন মাটি দিতে পারি-সরকারের কাছে এইটুকুই দাবি।”
নাহিদুল ইসলামের চাচা জানান,“সোমবার ড্রোন হামলার মাত্র আধাঘন্টা আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আমার ভাইপোর সঙ্গে মোবাইলে শেষবার কথা হয়। ভিডিও কলে সে দেখাচ্ছিল আশপাশে বোমা ফেলা হচ্ছে। সে বলছিল দ্রুত ফোন রাখতে, না হলে ট্র্যাকিং করে হামলা হতে পারে। সন্ধ্যায় জানতে পারি, সে নিহত হয়েছে।”
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন,“নিহত পরিবারের বাড়িতে এসে আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।”
এদিকে নিহত দুই পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা দুই প্রবাসী বাংলাদেশীর মরদেহ ফেরত পেতে দেশে আনার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।