নিউজ ডেস্ক : ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক জটিল সন্ধিক্ষণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নির্দ্বিধায় বিজয় ঘোষণা করতে পারছেন না। যুদ্ধ ক্রমেই বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিয়ন্ত্রণও ধীরে ধীরে হাতছাড়া হচ্ছে। আবার যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ালে যে অর্থনৈতিক পরিণতি হবে, তা কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধে থাকার চেয়েও ভয়ংকর।
এখন পর্যন্ত ট্রাম্প সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়েননি। তবে তিনি সাবেক দুই প্রেসিডেন্টের পরিণতির চক্রে আটকে গেছেন। তারা হলেন- লিন্ডন বি জনসন ও জর্জ ডব্লিউ বুশ। দুজনই ভিয়েতনাম ও ইরাকে হেরে যাওয়া যুদ্ধ কেবল দীর্ঘদিন টেনে নিয়েছিলেন।
এরই মধ্যে ট্রাম্পের সম্ভাব্য বিপদের নানা সংকেত স্পষ্ট হয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা ইরান যুদ্ধে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যুদ্ধে প্রভাব বিস্তারে ট্রাম্পের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ঘটনাটি হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া। ইরানের এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক ভাণ্ডার থাকলেও সব সমস্যা শক্তি প্রয়োগ করে সমাধান করা যায় না।
মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনানের মতে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করা না গেলে, কোনোভাবেই যুদ্ধে জয়ী দাবি করা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য প্রণালিটি ফের চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সে উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ।
১৯৭৯-৮১ সালে ইরানে জিম্মি সংকটের সময় মার্কিন রণতরী ইউএসএস নিমিৎজের দায়িত্বে ছিলেন ব্রেনান। তিনি বলেন, এই সংঘাত প্রত্যাশার চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। কারণ, সংঘাতের প্রতিক্রিয়া শুধু তেলের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বৃহস্পতিবার ইরাকের আকাশে একটি মার্কিন ট্যাংকার বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়। যা ব্যাপক পরিসরে সামরিক শক্তি মোতায়েনের ঝুঁকি ও খরচকে সামনে এনেছে। সাত মার্কিন নাগরিক নিহতের ঘটনা তো আছেই। তাছাড়া, যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার ভার্জিনিয়া ও মিশিগানে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। যদিও এসব ঘটনার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সরাসরি সম্পর্ক থাকার বিষয়টি নিশ্চিত নয়, তবু বাড়তি উত্তেজনার মধ্যে ভার্জিনিয়ার গুলির ঘটনাকে কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবাদ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন জানিয়েছে, মিশিগানে একটি সিনাগগে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ‘ইহুদিদের লক্ষ্য করে সহিংসতার’ মতো।
যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে বলেছিল, ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ বন্ধ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করে আমেরিকানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু ভার্জিনিয়া ও মিশিগানের ঘটনার সংকেতগুলো হোয়াইট হাউসের সেই আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি সংকট
এটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনাও ঘটেছে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে ফিলিং স্টেশনে জ্বালানির দামে।
জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং সমুদ্র ও আকাশপথে হামলা চালাতে সক্ষম ইরানি ড্রোনের ঝুঁকি বিবেচনায় মার্কিন নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ জলপথটিতে প্রবেশ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে প্রণালিটি দ্রুত চালু করার মতো কোনো স্পষ্ট সামরিক সমাধান এখনো নেই। এই পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে রাজনৈতিক সমাধান হয়তো তুলনামূলক ভালো পথ হতে পারে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি করা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের বিপরীতে ইরান উল্টো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণকারী সংস্থা ডিফেন্স প্রায়োরিটিসের সামরিক বিভাগের পরিচালক জেনিফার ক্যাভানা বলছেন, শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খোলা প্রায় অসম্ভব। খুব অল্পসংখ্যক এবং তুলনামূলক সস্তা ড্রোন দিয়েই ইরান এটিকে বন্ধ রাখতে পারবে।
জেনিফার বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে অনেকে বলেছিলেন ইরানের তৈরি করা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। এখনো একই কথা প্রযোজ্য। সামরিকভাবে সমাধানের আর কোনো উপায় নেই। কারণ, জোরপূর্বক প্রণালি খুললেও তা কতদিন স্বাভাবিক রাখা যাবে?
সর্বোচ্চ নেতা প্রসঙ্গ
আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনা যুদ্ধের শুরুতে সফলতা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু শাসনব্যবস্থা টিকে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন সেটি নিয়ে আর কোনো আলাপ করছে না। আলি খামেনির জায়গায় তাঁর ছেলের ক্ষমতায় আসাটা ট্রাম্পের বিজয় দাবির প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটের নেতারা ট্রাম্পের অভিযানকে কৌশলগতভাবে ব্যর্থ বলার সুযোগ পাচ্ছেন।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটের সদস্য জ্যাক অকিনক্লস এরইমধ্যে বলেছেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার চেয়েও বেশি কট্টর। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনি আরো বেশি কঠোর অবস্থান নেবেন।
ইসরায়েল কি যুদ্ধ থামাবে?
রাজনৈতিক কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি যুদ্ধ বন্ধে রাজিও হন, তাতে ইসরায়েল একমত হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে তেলআবিব দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সঙ্গে অনেক বেশি অভ্যস্ত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য একরকম নাও হতে পারে।
গত রোববার ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বিষয়টি তাঁর ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পারস্পরিক সিদ্ধান্ত দ্বারা নির্ধারিত হবে। এমন মন্তব্য দীর্ঘদিনের একটি সন্দেহকে উসকে দিচ্ছে। সেটি হলো- কোনো বিদেশি রাষ্ট্র কি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামরিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে?
ইসরায়েল এমন একটি দেশ, যারা যুদ্ধ বাধিয়ে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে না। গাজা, লেবানন, ইরান ও সিরিয়ায় তারা একের পর এক সামরিক অভিযান চালিয়েছে। যা বোঝায়, ইসরায়েলের কাছে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অর্থ হলো অনবরত অভিযান চালানো।
স্পষ্ট বয়ানের অভাব
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী বলে মনে হয়েছে। ফলে এমন বয়ান দিয়ে একটি সুসংহত বিজয়ের গল্প দাঁড় করানো কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে বিজয়ের মালা গাঁথা আরও কঠিন হবে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন
ইরান যদি ইউরেনিয়ামের মজুত ধরে রাখতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক কর্মসূচি চালুর সম্ভাবনা আছে বলে অনেকে ধারণা করেন। জল্পনা আছে, এই তেজস্ক্রিয় উপাদান উদ্ধারে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প হয়তো বিশেষ বাহিনী পাঠানোর অনুমতি দেবেন। কিন্তু এমন অভিযানের জন্য বড় আকারের স্থলবাহিনী প্রয়োজন। বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান।
জাতিসংঘের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার ধারণা, ইসফাহানে এখনো প্রায় ২০০ কিলোগ্রাম উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে। এই মজুত পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটনের লক্ষ্য পূরণ হবে না।
ইরানে রাজনৈতিক স্থবিরতা
যুদ্ধ শুরুর সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।’ তিনি দাবি করেছিলেন, ধর্মভিত্তিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য এটি সবচেয়ে বড় সুযোগ। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো গণঅভ্যুত্থানের লক্ষণ দেখা যায়নি।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধ থেমে গেলে ইরানের সরকার আরও কঠোর দমন-পীড়নের পথে এগোবে। যা যুদ্ধ শুরুর দিনে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার শামিল।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি
যুদ্ধে সাত নাগরিক নিহত হওয়ায় আমেরিকানরা একদিকে শোক করছে, অন্যদিকে পেট্রলের ঊর্ধ্বমুখী দাম অন্যান্য পণ্যের খরচ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে মার্কিন নাগরিকরা ট্রাম্পের যুদ্ধ জয়ের আনন্দে কতটা শামিল হবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় ট্রাম্পের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাই, সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে হলে ট্রাম্পের সামনে ইরান যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনার বিকল্প নেই।