নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সুলভ ঈদ বাজারে অর্ধেকের কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করেছে সামাজিক সংগঠন ‘ব্যাক বেঞ্চার’। এই বাজারে চাল, আটা, সয়াবিন তেল, সেমাই, চিনি, দুধ, মুরগীর মাংসসহ প্রায় সাড়ে ৮শ’ মূল্যের ১০টি পণ্য ৪০০ টাকায় ক্রয় করেছে প্রায় ১২শ’ পরিবার। শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যশোর শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়কের পাশে বসে অস্থায়ী এই বাজার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে স্বল্প আয়ের মানুষের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেই এসএসসি ১৯৯৯ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়া সামাজিক সংগঠন ‘ব্যাক বেঞ্চার’ এই ঈদ বাজারের আয়োজন করে।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ব্যাক বেঞ্চার’র সদস্যরা কেউ চাকরিজীবী কেউ বা ব্যবসায়ী। এই সদস্যদের চাঁদার টাকা দিয়ে চলে নানামুখী স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড। সংগঠনটি মূলত দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করে। পাশাপাশি শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, রক্তদান, সামাজিকভাবে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড করে আসছেন। করোনাকালে সংগঠনটি অক্সিজেন সেবা, খাদ্যসামগ্রী বিতরণের মধ্যে দিয়ে মানুষের পাশে ছিলেন। স্বেচ্ছাসেবার ধারাবাহিকতার অংশ হিসাবে সংগঠনের সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেন দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার। এজন্য তারা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে যারা সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, তাদের জন্য আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঈদ বাজারের ব্যবস্থা করেন। এরপর যশোর শহর ও শহরতলী বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় জরিপ চালিয়ে প্রায় ১২শ’ জন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে শনাক্ত করে সংগঠনটি। তাদেরকে ঈদে দরকারি এমন ৮৫০ টাকা মূল্যের ১০টি পণ্য অর্ধেক মূল্যের চেয়ে কমে মাত্র ৪০০ টাকায় প্রদান করা হয়। এবার নিয়ে টানা তিন বছর তারা এই সুলভ ঈদ বাজারে অর্ধেক টাকা ভর্তুকি দিয়ে পণ্য বিক্রি করছে।
শুক্রবার দুপুরে এই ঈদ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, যশোর শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়কের নতুন বাজার প্রাঙ্গনে নারী-পুরুষের লম্বা লাইন। বিভিন্ন পণ্যের স্টলও রয়েছে। ওই সব স্টলের টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পণ্য। ক্যাশ কাউন্টারে পণ্যের দাম পরিশোধ করে একটি স্লিপ নিয়ে লাইন থেকে একজন একজন করে স্টলে গিয়ে পছন্দের পণ্য ব্যাগে ভরে নিচ্ছেন।
সিটি কলেজপাড়া এলাকা থেকে বাজার করতে আসা বৃদ্ধ রাজমিস্ত্রি সিদ্দিক হোসেন জানান, বয়স হয়েছে, এখন কাজ করতে পারেন না। ছোট ছেলের উপার্জনে কোনো মতে সংসার চলে। জিনিসপত্রের এখন যে দাম; সংসার চালানো কঠিন। এর মধ্যে রোজা ঈদ উপলক্ষে সকল পণ্যের দাম আরোও বেড়েছে। চিন্তাতে ছিলাম ঈদে কিভাবে কী করবো। এই বাজার থেকে অর্ধেক দামে জিনিসপত্র কিনতে পেরে ঈদের আগে ঈদের আনন্দ পেলাম।
আসমা খাতুন শহরের একটি বাসা বাড়িতে কাজ করেন। তিনিও এসেছেন ‘ব্যাক বেঞ্চার’ সূলভ ঈদবাজারে। তিনি বলেন, ‘বাজারে যে জিনিসের দাম বাড়ছে। কম দামে পণ্য পেয়ে আমার মতো গরিব মানুষের অনেক উপকার হইছে। এই সংগঠনের মতো আরও দুটো সংগঠন হলে এই অঞ্চলের গরিব মধ্যবিত্তদের খুব উপকার হতো।’
আমেনার মতো এসেছেন শামীম হোসেনও। প্রায় অচল প্যারলাইজড এই মানুষটি বলেন, ‘এই ১০টি পণ্যের বাজার দর ৮শ’ টাকার বেশি। তবে আমি কিনেছি ৪শ’ টাকায়। পোলাও চাল, তেল মুরগিসহ ১০টি জিনিস রয়েছে। এমন কাজের জন্য এই সংগঠনকে দোয়া ছাড়া কিছু করার নাই আমাদের।’
সংগঠনটির সভাপতি জাকিউল ইসলাম পিংকু বলেন- নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের যে উর্ধ্বগতি; এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা কষ্টে আছে। তারা কষ্টে থাকলেও কারোও কাছে হাত পাততে পারে না। তাদের জন্য আমাদের এই বাজার। তারা যেন ঈদের দিন পরিবার নিয়ে ভালো থাকতে পারে সেই জন্য আমাদের এই আয়োজন।’
সংগঠনটির উপদেষ্টা শাহনেওয়াজ আনোয়ার লেনিন বলেন- ‘বাজারমূল্যের যে অর্ধেকদামে আমরা ১০টি পণ্য বিক্রয় করছি। ঈদের দিন দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষরা দ্রব্যমূল্যের কারণে কাঙ্ক্ষিত ঈদবাজার করতে পারে না। পোলাও মাংস খেতে পারে না। তাদের কথা মাথায় রেখে আমরা মুরগির মাংস, পোলাও চালসহ দরকারি ১০টি পণ্য পর্যপ্ত পরিমাণে তাদের কাছে কমমূল্যে বিক্রয় করছি। যাতে তারা আনন্দের সঙ্গে ঈদটা করতে পারে। এই নিয়ে টানা তিন বছর আমরা এমন আয়োজন করছি।
তিনি আরও বলেন- প্রথমে আমরা নিজেদের উদ্যোগে অসহায়দের মাঝে একবেলার খাবারের আয়োজন শুরু করি। পরে অনেক ভালো মনের মানুষ আমাদের সংগঠনটিতে শরিক হচ্ছেন। এছাড়া অনেক দানশীল ব্যক্তির সহযোগিতায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ব্যাক বেঞ্চার’ কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় গণ্যমান্যব্যক্তিরা। বিশিষ্ট রাজনীতিক ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘ব্যাক বেঞ্চার’ দীর্ঘদিন ধরে এই আরএন রোড এলাকায় ভালো কাজ করে আসছে। এখন তো যুবকদের ভালো কাজের সঙ্গে দেখা মিলে না; যে যার কাজে ব্যস্ত। কিন্তু এসব যুবকরা নিজের সময় শ্রম অর্থ দিয়ে সমাজের হতদরিদ্র মানুষের জন্য যে কাজ করছে সেটা সমাজের দৃষ্টান্ত। এদের মতো পাড়ায় পাড়ায় এমন সংগঠন গড়ে উঠলে সমাজে এতো বৈষম্য থাকতো না। ধনি গরিবের মধ্যে এতো ভেদাভেদ দূরত্ব সৃষ্টি হতো না।’