রাজয় রাব্বি, অভয়নগর (যশোর) : বর্ষা মৌসুমে যশোরের দুঃখখ্যাত অভয়নগর উপজেলার ভবদহ অঞ্চলে ফের জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। টানা বৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, বীজতলার মাঠ ও মাছের ঘের প্লাবিত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় পড়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। প্রতি বছর প্রায় ছয় মাস পানিবন্দি জীবন কাটানো ভবদহবাসী এবারও একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়েছেন। এ বছর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নদী ও খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হওয়ায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশা জেগেছিল এলাকাবাসীর মধ্যে। কিন্তু বর্ষার শুরুতেই অতিবৃষ্টির কারণে পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সেই আশায় ভাটা পড়েছে। ইতোমধ্যে বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি, সড়ক ও মৎস্য খামার পানিতে তলিয়ে গেছে। সরেজমিনে উপজেলার বেদভিটা, ডুমুরতলা, ধোপাদী, কোটা ও দিঘলিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িতে যাতায়াতের জন্য বাসিন্দারা অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করেছেন। অনেক পরিবার গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। অধিকাংশ মাছের ঘেরের পাড় পানিতে তলিয়ে গেছে। মাছ যাতে বেরিয়ে না যায়, সে জন্য চাষিরা বাঁশ ও নেট দিয়ে অস্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। বাড়ির আঙিনায় চাষ করা বিভিন্ন ধরনের সবজিও নষ্ট হচ্ছে। উপজেলার ডুমুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কমলেশ টিকাদার জানান, বিদ্যালয়ের মাঠ ও প্রবেশপথ সম্পূর্ণ পানির নিচে চলে গেছে। বিদ্যালয়ের নিচতলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বেদভিটা গ্রামের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, তাদের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা এখন পানির নিচে। একইভাবে নওয়াপাড়া-মশিয়াহাটি সড়কের ডুমুরতলা অংশেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, ফলে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের মৎস্যচাষি আকাশ রায় বলেন, মাছ রক্ষার জন্য আগেই নেট কেনা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় তা বসানোর সুযোগ পাননি। উল্টো বৃষ্টির সুযোগে ব্যবসায়ীরা নেটের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা লিপটন সরদার জানান, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে উপজেলার ২২০টি মাছের ঘের, যার মোট আয়তন প্রায় ৫০৩ হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৭ কোটি টাকা। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতা ইকবাল জাহিদ বলেন, ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু নদী খনন নয়, টিআরএম বাস্তবায়নও জরুরি। খর্ণিয়া ব্রিজের দক্ষিণে অস্থায়ী বাঁধের কারণে পলি জমে প্রায় সাত কিলোমিটার নদীপথ ভরাট হওয়ায় চলতি বর্ষায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখননের কাজ চলছে, তবুও বর্ষার শুরুতেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় প্রকল্পের সুফল নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জি বলেন, খর্ণিয়া এলাকায় ড্রেজিং কাজ বিলম্বিত হওয়ায় পানি নিষ্কাশনে সাময়িক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে ৯টি সুইস গেট খোলা রয়েছে এবং পানির উচ্চতা ইতোমধ্যে প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৫ ইঞ্চি কমেছে। ভারী বৃষ্টিপাত না হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাড়িঘর, আঙিনা ও সড়ক থেকে পানি উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে যাবে। তিনি আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে সব সুইস গেট চালু করা হচ্ছে। বর্তমানে ২৯টি গেট প্রস্তুত রয়েছে এবং আরও ১১টি গেট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সব গেট চালু হলে আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।