নিজস্ব প্রতিবেদক : চারিদিকে শুধু আবর্জনার পাহাড়। বাতাসে ভাসছে তীব্র পচা দুর্গন্ধ। যশোর-নড়াইল মহাসড়কের হামিদপুর সড়কের যাতায়াতকারী মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী এই দুর্গন্ধ আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে চালু করা দেশের প্রথম সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্টের বর্তমান চিত্র এটি। ২০১৮ সালে শহরতলীর ঝুমঝুমপুরে ১৩ দশমিক ২৫ একর জায়গার উপর প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্লান্ট থেকে পরিকল্পনা ছিল পৌরসভার বাসা-বাড়ির বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হবে জৈব সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের। তবে বর্তমানে শুধু সীমিত পরিসরে জৈব সার উৎপাদন হলেও বন্ধ আছে বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার স্বপ্ন এখন যশোর পৌরবাসীর জন্য বিষাদে রূপ নিয়েছে। বিপুল অর্থ বিনিয়োগে চালু হওয়া দেশের প্রথম সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্টটি সঠিকভাবে পরিচালনার অভাবে এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে শহরের অলিতে-গলিতে জমছে বাসাবাড়ির বর্জ্যের স্তূপ, যা এখন নাগরিকদের জন্য বড় বোঝা। অন্যদিকে, দুর্গন্ধ আর নোংরা পানির কারণে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন প্লান্ট এলাকার বাসিন্দারা। অন্যদিকে প্রকল্পটি দিয়ে শতভাগ সুফল দিতে না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ পৌরবাসী। যশোর পৌর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, ‘জনগণের টাকায় একটি প্লান্ট তৈরি করা হলেও কোন কাজে লাগছে না। এমনকি পৌরশহরে বর্জ্যও পরিষ্কার হচ্ছে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এত বড় প্রকেল্প কাক্সিক্ষত ফলাফল না পাওয়া জনগণের অর্থের চরম অপচয় হয়েছে। এই প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কোথায় ত্রুটি ছিল, তা খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি চিহ্নিত করে দ্রুত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’ # অলিতে-গলিতে পড়ে থাকে বাসাবাড়ির বর্জ্যের স্তূপ ২০১৯ সালে প্ল্যান্টটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের সময়ে তিনি বলেছিলেন, যশোরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নগরী রাখবে এই প্লান্ট। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রোলমডেলও হবে এই প্লান্ট। এছাড়া যশোর পৌরসভাই নয়, পাশ্ববর্তী ঝিকরগাছা পৌরসভাসহ নিকটবর্তী শহর সংলগ্ন এলাকার বর্জ্যও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে নেয়ার পরিকল্পনা ছিল পৌরসভার। এ ছাড়া, সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব জৈব সার ও বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদিত হবার লক্ষ্য ছিল তাদের। যা পাইপলাইনের মাধ্যমে আশপাশের এলাকার বাসাবাড়িতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সরবরাহ করবে বলেও পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু চালু হওয়ার বছর খানিকের ভিতরেই মুখথুবড়ে পড়ে। যা সময়ের সাথে এখন প্লান্টটিতে নানা স্থবিরতা। যে শহরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা কথা থাকলেও শহরের অলিতে গলিতে পড়ে থাকে বর্জ্য স্তুপ। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণস্থাপনার পাশে দিন রাত ময়লা পড়ে থেকে তৈরি হয়েছে ভাগাড়। ছড়ায় দুগন্ধ। বেড়পাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, ‘সড়কের পাশে পড়ে থাকে বর্জ্য। দিনের পর দিন থেকে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কুকুরও বিভিন্ন ময়লা ছড়িয়ে এলাকা নোংরা করে। শুধু এই জায়গা না শহরের বিভিন্ন সড়কের দৃশ্য এই রকম। অথচ বর্জ্য প্লান্ট থাকার পরেও এই রকম পরিবেশ থাকাটা আসলেই দুঃখজনক।’ ঝুমঝুমপুর বর্জ্য প্লান্ট এলাকার বাসিন্দা হুমায়ন কবির বলেন, ‘প্লান্টে ময়লার সঠিক ব্যবহার না হওয়াতে প্লান্টের ভিতরে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি হলে সেই পানি ঢুকে যাচ্ছে পাশের এলাকাতে। বিষক্ত ও ময়লাপানি এলাকা দূষিত করছে। ছড়াচ্ছে নানা রোগও। এছাড়া দুর্গন্ধ তো রয়েছে। এলাকায় বসাবস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ #লোকসান ঠেকাতে ইজারা, তবুও বদলায়নি প্লান্টের চিত্র বিপুল অর্থ বিনিয়োগের এই মেগা প্রজেক্ট থেকে এ পর্যন্ত পৌরসভার আয় সাকল্যে মাত্র ১৫ লাখ টাকা। লোকসান আর সংকট কাটাতে গত কয়েক বছর প্লান্টটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়া হলেও বদলায়নি ভাগ্য। সর্বশেষ ২০২২ সালে ২০ বছরের জন্য প্লান্ট পরিচালনার দায়িত্ব পান দ্যা স্কেট লিমিটেড। তারা জানান, প্রতিদিন প্রায় ৮০ টন বর্জ্য এখানে আনা হলেও, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং বর্জ্য আলাদাকরণ জটিলতায় প্রতিদিনের উৎপাদিত বর্জ্যের মাত্র ১৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে বন্ধ আছে বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্টের ইনচার্জ মো. সোহেল রেজা বলেন, ‘এ প্ল্যান্টের প্রতিদিন ৪০ টন ময়লা বাছাই করার সক্ষমতা। কিন্তু আমরা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সেগ্রিগেশন করতে পারি, কারণ আমাদের সেগ্রিগেশন করার মেশিন নাই। এই কারণে কাঁচা ময়লার বিশাল একটা স্তূপ হয়ে যাচ্ছে। সেগ্রিগেশন মেশিন থাকলে শতভাগ ময়লাকে সম্পদে রূপান্তরের ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিদিন ৮০ টন ময়লা আসছে। আমরা এই ময়লাটা বাছাই না করে স্তূপ করছি এবং পুরনো জমা করা ময়লা বা লেগেসি ওয়েস্ট দিয়ে আমরা সার বানাচ্ছি। এ অবস্থায় প্রতিদিন উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। গড়ে মাসে ১২ দিন উৎপাদন সম্ভব হয়। যদি সেগ্রিগেশন মেশিন আমরা পাই, তাহলে ৩০ দিনই মেশিন চালানো সম্ভব। এই প্লান্টটিকে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টে পুরো বাংলাদেশে একটা রোল মডেল হিসেবে দাঁড় করানো যাবে।’ সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্লান্টটি পরিদর্শন করেছেন পরিদর্শনকালে প্লান্টটির বেহাল অবস্থার কারণে যশোর পৌরকর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর আশ্বাস দেন। প্লান্টটির গতি ফেরাতে সকল উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন। পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান বলেন, ‘আপাতত আমাদের এ প্রকল্পটি কোনো রকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। সমস্যা সমাধানে বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। আমরা কয়েকটি মিটিংও করেছি।সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও এটির গতি ফেরাতে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। দ্রুতই প্লান্টটির সকল সমস্যা দুর করে পূর্ণ শক্তিতে ফিরবে এই প্রতিষ্ঠানটি।’