ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর , ২০২১ ● ১১ কার্তিক ১৪২৮

সুন্দরবনের শিকারী চক্রের লাগাম টানতে ব্যর্থ বনবিভাগ!

Published : Saturday 06-February-2021 21:12:57 pm
এখন সময়: মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর , ২০২১ ১৫:০২:৫০ pm

আ. মালেক রেজা, শরণখোলা (বাগেরহাট)  : কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না সুন্দরবনের চোরা শিকারী চক্রের। পাচারের ক্ষেত্রে ওই সকল চক্রের প্রধান টার্গেট বনের হরিণ ও বাঘ। করোনার সুযোগ নিয়ে শিকারীরা বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন থেকে বাঘ ও হরিণ শিকারের এক প্রকার প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন। আর এ সকল শিকারী চক্রের অপরাধ দমনে ব্যর্থ হচ্ছেন বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীরা। অভিযোগ রয়েছে, বন সংলগ্ন এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার না থাকাসহ বনবিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের অতি লোভের কারণে বন্যপ্রাণিসহ বনসম্পদ পাচার কার্যক্রমের পুরোপুরি লাগাম টানা যাচ্ছে না।

২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে একটি বাঘ ও ১৯ টি হরিণের চামড়া এবং তিন মণ হরিণের মাংসসহ ১১ জন চোরা শিকারী ও পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি শরণখোলা উপজেলার রাজৈর এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বাঘের চামড়াসহ উপজেলার সাউথখালী এলাকার বাসিন্দা জেলে মো. গাউস ফকির (৫০)কে আটক করে র‌্যাব-৮ ও বনরক্ষীরা।  জিজ্ঞাসাবাদে ওই জেলে জানায়, বাঘের চামড়াটি  সুন্দরববন সংলগ্ন সোনাতলা গ্রামের বাসিন্দা মো. সোহরাপ হোসেনের ছেলে ওহিদুল এবং ওবায়দুল বিক্রির জন্য তার কাছে দেন।

এছাড়া ২২ জানুয়ারি উপজেলার রায়েন্দা রাজৈর কেন্দ্রীয় বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় বাগেরহাট জেলা (গোয়েন্দা পুলিশ) ডিবির একটি দল অভিযান চালিয়ে ১৯টি হরিণের চামড়াসহ বাগেরহাট সদর উপজেলার বাসিন্দা  মোশারফ শেখের ছেলে ড্রাইভার মনির হোসেন শেখ (৪৫) এর বাসা থেকে ১৯টি হরিণের চামড়া উদ্ধার করে। এ সময় তার স্বীকরোক্তি মতে, রাজৈর গ্রামের বাসিন্দা ও বন্যপ্রাণি পাচার চক্রের (সাবেক) সদস্য মতিয়ার রহমান কাজী (ওরফে মতি কাজীর) ছেলে ও উপজেলা প্রশাসন মার্কেটের মুরগী ব্যবসায়ী ইলিয়াস কাজী (৩৫)কে আটক করেন এবং ২৫ জানুয়ারি রাতে খুলনার পানখালী এলাকা থেকে ১১ কেজি হরিণের মাংসসহ ২ শিকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

অপরদিকে, ৩০ জানুয়ারি মোংলা কোষ্টর্গাড ৪৭ কেজি হরিণের মাংস ও একটি মাথা সহ খুলনার দাকোপ এলাকার মোনা সর্দার (৩২) রামপাল এলাকার জাহিদ শেখ (৩৮) ও মোংলার  চিলা এলাকার বাসিন্দা শহীদুল শেখ (৪৫)কে  আটক করেন। তাছাড়া ৩১ জানুয়ারি শরণখোলা উপজেলার দক্ষিণ রাজাপুর এলাকা থেকে ২০ কেজি হরিণের মাংসসহ যশোর ঝিকরগাছার দেওয়ালী গ্রামের বাসিন্দা আঃ লতিফ মোড়লের ছেলে ও রায়েন্দা বাজার এলাকার ভাড়াটিয়া মিলন শেখ (৩৫)কে আটক করে বনরক্ষীরা। এ সময় মিলন জানায়, শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা গ্রামে তিনি বিয়ে করার সুবাদে বহুদিন আগে তার সাথে পুর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ সংলগ্ন ঢালীরঘোপ এলাকার বাসিন্দা হাবিব তালুকদার, তানজের বয়াতী ও বকুলতলা গ্রামের বাসিন্দা মো. চাঁন মিয়া হাওলাদার (ওরফে চাঁন্দু) সাথে পরিচয় ঘটে। পরবর্তীতে সুন্দরবন হতে তাদের শিকার করা হরিণের মাংস সে দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে আসছিলেন। সর্বশেষ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ১ ফেব্রুয়ারি রামপাল উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে ৪২ কেজি হরিণের মাংস, ৩টি মাথাসহ  মো. আ. রহমান শেখ (৫২) এবং তার ছেলে মোস্তাকিন শেখ (২৭) কে আটক করে। 

জানা গেছে, সুন্দরবন থেকে বিভিন্ন কায়দায় শিকার করে আনা ওই সকল বন্যপ্রাণির অঙ্গ প্রত্যঙ্গ শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের সীমানা পেরিয়ে চলে যায় আর্ন্তজাতিক চোরাই বাজারে। তবে, এসব চক্রের হোতারা রহস্যজনক কারণে সব সময় পর্দার অন্তরালে থাকায় বন্যপ্রাণি পাচারকারী চক্রের লাগাম টানা যাচ্ছেনা বলে অভিমত বন বিশেষজ্ঞদের। এ পর্যন্ত বন বিভাগের হিসেবে ৫৪ টি বাঘের নানা কারণে মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিক ভাবে মারা গেছে ১৫টি। লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় গ্রামবাসীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে ১৪টি। আর চোরা শিকারীরা বিভিন্ন হত্যা করেছে ২৬ টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

তবে, জেলে গাউস ফকিরের স্ত্রী মোসা তহমিনা বেগম (৪০) বলেন, আমার স্বামী একজন নিরীহ জেলে ঘটনার কয়েকদিন আগে তার কাছে শুধু ফোন আসতে দেেিখছি। তাকে প্রভাবশালীরা টাকার লোভ দেখিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন।

এছাড়া নাম গোপন রাখার শর্তে শরণখোলা এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, জেলে গাউস ফকির এক সময়ে চান্দুর সাথে বনের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরতেন। উদ্ধার হওয়া বাঘের চামড়ার সাথে চান্দু জড়িত থাকতে পারে এবং শরণখোলা রেঞ্জের (এসিএফ) মো. জয়নাল আবেদীনের খুব আস্থাভাজন লোক হচ্ছে জেলে নামধারী চান্দু হাওলাদার। সে (এসিএফ) এর দোহাই দিয়ে সুন্দরবনের নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ ধরেন। কোনো জেলে মাছ না পেলেও চান্দু পাবেই এবং চান্দুর ভাই মো. নাছির হাওলাদার সুন্দরবনের জ্ঞানপাড়া টহল ফাঁড়ির ট্রলার ড্রাইভার থেকে হরিণ পাচারকারীদেরকে সহায়তা করে যাচ্ছে। তবে এসকল বিষয়ে অস্বীকার করে চান্দু বলেন, এক সময়ে জয়নাল স্যার আমাকে কিছু কাজকর্ম দিতেন। এখন আর কোন কাজ দেন না। তাছাড়া সুন্দরবনে আমি বৈধ ভাবে প্রবেশ করে পাস পারমিট (অনুমতি) নিয়ে মাছ ধরি। তবে বন্যপ্রাণি ও বনসম্পদ পাচারের সাথে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ীরা আমার নামে মিথ্যা বদনাম রটাচ্ছে। অপররদিকে, ব্যবসায়ী ইলিয়াস কাজীর স্ত্রী মর্জিনা বেগম বলেন, হরিণের চামড়ার বিষয়ে আমার স্বামী কিছুই জানে না। প্রতিপক্ষরা তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসিয়েছেন। তবে, সুন্দরবনসহ ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি ও উপজেলা কৃষকলীগ নেতা মো. ওয়াদুদ আকন বলেন, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণি নিধনের ক্ষেত্রে বন সংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালীরা অনেকটা দায়ী। কিছু অসাধু লোক তাদের ছত্রছায়ায় থেকে এসব অপকর্ম করে আসছেন। পাশাপাশি বনবিভাগসহ পুলিশের টহল টহল ব্যবস্থা জোরদার না থাকার কারণে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা মোটর সাইকেলসহ বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে ঢাকা, চট্রগ্রাম, বাগেরহাটসহ দেশেরে নানা প্রান্তে পাচার করার সাহস পাচ্ছেন। যার ২/১টি চালান মাঝে মধ্যে ধরা পড়লেও অধিকাংশ ধরা ছোঁয়ার বাইরে। নিয়ম অনুযায়ী জেলেদের সকল নৌকা ও ট্রলার জঙ্গলে প্রবেশ কালে এবং বের হওয়ার সময় বনরক্ষীরা তল্লাশী করবেন কিন্তু তারা অনেক ক্ষেত্রে ম্যানেজ হয়ে সঠিক ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন না। তাছাড়া পুলিশের টহল বৃদ্ধি করে ভাড়ায় চালিত মটর সাইকেলসহ ঢাকা চট্রগ্রামগামী পরিবহনগুলোর দিকে নজরদারী বাড়ানো হলে পাচার কার্যক্রম বন্ধ হবে।

এ বিষয়ে জানতে শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক জয়নাল আবেদীনের মুঠোফোনে ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইদুর রহমান জানান, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারী বৃদ্ধির কারণে পাচারকারীরা আটক হচ্ছে এবং শরণখোলা থানা পুলিশের টহল ব্যবস্থা পুর্বের চেয়ে ইতোমধ্যে আরো জোরদার করা হয়েছে।

এছাড়া পুর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, চোরা শিকারীদের ধরতে অভিযান চলছে এবং বন্যপ্রাণির অবাধ বিচারণের জন্য সুন্দরবনের ৫০ভাগ এলাকা সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। তাছাড়া পাচারকারী চক্রের হোতাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রমাণ সাপেক্ষে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

খুলনা বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (সিএফ) মোঃ মহিউদ্দিন খাঁন বলেন, সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন রেঞ্জে আগের চেয়ে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে এজন্য বনবিভাগের নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। এসব পাচার কাজে সাথে যদি বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



আরও খবর