ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ সোমবার, ১৮ অক্টোবর , ২০২১ ● ২ কার্তিক ১৪২৮

সুন্দরবনে ১৭ বছরে ২৫ বার আগুন: বনজসম্পদ লুটছে প্রভাবশালী চক্র!

Published : Saturday 13-February-2021 21:55:45 pm
এখন সময়: সোমবার, ১৮ অক্টোবর , ২০২১ ০০:১৩:০৬ am

 

আ. মালেক রেজা, শরণখোলা (বাগেরহাট) : বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবন। বিভিন্ন কারণে সংঘঠিত অগ্নিকাণ্ড ও নাশকতার আগুনে বনের গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় অনেকটা ফাঁকা হচ্ছে সুন্দরবন। প্রাকৃতিক এ বনকে চিরচেনা রুপে ফিরতে কিংবা প্রায় ২৫ বারের মত অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন বলে অভিমত বিশেজ্ঞদের। প্রাণি ও মৎস্য এবং মধুসহ বনের সম্পদ লুটতে একাধিক চক্র সক্রিয় হওয়ার কারণে বার বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে সুন্দরবনে। অপরদিকে, বন সংশ্লিষ্ট এলাকার টহল ফাঁড়িগুলোতে পাহারার কাজে ২/৪ জন বনকর্মী থাকলেও বনজ সম্পদ পাচারকারী চক্রের কাছে তারা অসহায়।

বনবিভাগের দাবি, সুন্দরবন লাগোয়া ঘনবসতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য এখন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুন্দরবনকে যে সকল অপরাধ সংঘঠিত হচ্ছে তার অধিকাংশ ঘটনার সাথে ওই জনবসতিদের কারো না কারো সম্পৃক্ততা থাকে। জনবল সংকটের কারণে নিরন্তন চেষ্টা করেও অপরাধী চক্রের লাগাম টানতে পারছে না বনবিভাগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনের নানা সম্পদ লুটতে প্রভাবশালী চক্র বনসংলগ্ন এলাকার জনবসতিদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তিকে প্রলোভন দেখিয়ে বনের অভ্যন্তরে পাঠিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে একপ্রকার বাধ্য করে। গত ১৭ বছরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় ২৫ বারের মত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও অপরাধী চিহ্নিত কিংবা আইনের আওতায় আসেনি প্রভাবশালী চক্র। সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর এলাকাকে  ইতোমধ্যে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ওই সকল জলাশয়ের মাছ,  বনের মধুসহ বনজ ও প্রাণি সম্পদ লুটের উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী চক্র কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা কর্মচারীদের ম্যানেজ করে থাকেন। ২০০৪ সাল থেকে গত ১৭ বছরে সুন্দরবনের যে সব এলাকা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই সব এলাকাগুলো আজও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি বলে নেই বন্যপ্রাণির বিচরণ। বিশেজ্ঞদের মতে, দফায় দফায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়  সুন্দরবনের ওই সকল স্থানের জীবজন্তু, পশু-পাখি অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। তাছাড়া এভাবে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সুন্দরবন সুরক্ষা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

নাম গোপন রাখার শর্তে বনসংলগ্ন এলাকার দুই সমাজ সেবক বলেন, সুন্দরবনের পার্শ্বে বসবাসরত বাসিন্দাদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় সুন্দরবনের ছোট খালে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ও টোপ দিয়ে হরিণ শিকারের পাশাপাশি বাঘ হত্যায়ও জড়িয়ে পড়েন। শুষ্ক মৌসুম আসলেই অবৈধভাবে বিভিন্ন জলাশয়ের মাছ এবং আগুনের কুন্ডলী সাজিয়ে মধু সংগ্রহ করে থাকে। তাছাড়া বনরক্ষীদের তেমন কোনো টহল ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকসহ সাধারণ মানুষ বনের অভ্যন্তরে অবাধ যাতায়াত থাকায় বন্ধ করা যাচ্ছে না সুন্দরবনের নাশকতার আগুন। এমনকি রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা অনেক সময় বনরক্ষীদের উপর প্রভাব খাটিয়ে বনের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের ধান্ধায় তৎপর হয়ে ওঠে। প্রভাবশালীদের কথা অনুযায়ী কাজ না করলে সুন্দরবনে পেশাজীবীর কাজ করতে পারেন না বনসংলগ্ন এলাকার অনেক পরিবার। পেশাগত কাজে বনে প্রবেশ করে অনেক অসাধু লোক বন ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠছেন। তাই এসকল অসাধু পেশাজীবীসহ প্রভাবশালী চক্রের লাগাম টানতে না পারলে সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়বে।

তারা আরো জানান, এপর্যন্ত সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও বনবিভাগ শুধুমাত্র তদন্ত কমিটি করেই কোনোমতে দায় সেরেছেন। সুনিদৃষ্টভাবে কোনো চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারেননি তারা। এসকল কাজে প্রভাবশালী চক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ সুন্দরবনে কোনো ঘটনা ঘটলে প্রভাবশালীদের বাঁচাতে হয়রানির শিকার হন এলাকার সাধারণ মানুষ।

বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা প্রভাষক মো. কামাল হোসেন তালুকদার বলেন, পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর, কলমতেজী ও নাংলী এলাকায় প্রবেশ করলে বনের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে তেমন কোনো গাছপালা দেখা যায় না। চোখে পড়ে শুধু ঘাস আর লতাপাতা। সংশ্লিষ্ট এলাকার বনরক্ষীদের ম্যানেজ করে স্থানীয় কিছু লোক বছর জুড়ে তাদের পালিত মহিষ জঙ্গলে ছেড়ে ঘাস খাওয়ান। অনেক সময় মহিষ গুলো দেখাশুনার কাজে নিয়োজিত রাখালদের বিড়ি-সিগারেটের ফেলে দেয়া ফিল্টারের মাধ্যমেও সুন্দরবনে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি বনে অবৈধ যাতায়াত বন্ধে বনরক্ষীদের কঠোর নজরদারী থাকা উচিত। এছাড়া কোনো অসাধু মহল সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আগুন নিয়ে নাশকতা করতে পারে।

সুন্দরবন সুরক্ষায় নিয়োজিত সুন্দরবনসহ ব্যবস্থাপনা সংগঠন (সিএমসির) শরণখোলা রেঞ্জের সহসভাপতি ও শরণখোলা উপজেলা কৃষকলীগের সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ আকন বলেন, বনে আগুন দেয়া একটি বড় ধরনের নাশকতা। তাই দুর্বৃত্তায়নের হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে বনবিভাগের জনবল বৃদ্ধিসহ বনরক্ষীদের আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ২৪ ঘন্টা কঠোর নজরদারীসহ প্রভাবশালী চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মো. এনামুল হক বলেন, এবারের অগ্নিকাণ্ডে সুন্দবনের তেমন ক্ষতি হয়নি। বনের কিছু অংশের লতা-পাতা পুড়ে গেছে। খরব পেয়ে তাৎক্ষণিক বনবিভাগ ও ফায়ার সার্ভিস যৌথ চেষ্টা চালিয়ে আগুন বিনাশ করেছেন। পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ইতোমধ্যে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে এবং বনের ওই এলাকায় নজরদারী বৃদ্ধি করা হয়েেেছ। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান করে আগামি সাত কর্ম দিবসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এবং বন সংলগ্ন জনবসতি এখন সুন্দরবনের জন্য অনেকটা হুমকি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ব্যাপারে সুন্দরবন পুর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্তকর্তা (ডিএফও) মুহম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, শীঘ্রই সুন্দবনের জনবল সংকট দুর করে বনরক্ষীদের আরো দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য তাদেও উন্নত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হবে। মরে যাওয়া ভোলা নদী খননসহ সীমানায় কাঁটা তারের বেড়া দেয়ার জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি আগুনসহ চোরা কারবারীদের গতি বিধির উপর নজর রাখতে  সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বিগত দিনের অগ্নিকাণ্ডের সকল ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।