ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ বুধবার, ২৭ অক্টোবর , ২০২১ ● ১২ কার্তিক ১৪২৮

অভয়নগরের রাবেয়া বসরীকে বিয়ে করলেন র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো সেই লিমন

Published : Friday 03-September-2021 23:01:59 pm
এখন সময়: বুধবার, ২৭ অক্টোবর , ২০২১ ২৩:২০:০৬ pm

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো সেই লিমন। লিমন হোসেন ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের তোফাজ্জেল হোসেনের ছেলে। কনে যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌর এলাকার সরখোলা গ্রামের জাহিদুল ইসলাম টিটোর বড় মেয়ে রাবেয়া বসরী (১৯)। শুক্রবার দুপুরে কনের বাড়িতে ২ লাখ টাকা দেনমোহরে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়। কনে যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌর এলাকার সরখোলা গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম টিটোর মেয়ে রাবেয়া বসরী দুই ভাই-বোনের মধ্যে বড়। রাবেয়া এ বছর নওয়াপাড়া কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
দশ বছর আগে র‌্যাবের গুলিতে লিমনের পা হারানোর ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার সময় লিমনের পা হারানোর ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনা জন্ম দিয়েছিল। সেই সময় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল র‌্যাবের এই অভিযান। সেই লিমন এখন গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী প্রভাষক।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যরা জানান, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ফুয়াদ হোসেনের বাড়িও অভয়নগরের সরখোলা গ্রামে। তিনিই এ বিয়ের মধ্যস্থতা করেছেন।
শুক্রবার বিয়ে উপলক্ষে দশজনের বরযাত্রী বৃহস্পতিবার যশোরে চলে আসেন। বরযাত্রীর মধ্যে ছিলেন, লিমন হোসেনের বাবা-মা ও নিকট আত্মীয়রা। দুপুর ১২টার দিকে বরযাত্রী কনে রাবেয়া বসরীর বাড়িতে পৌঁছান। জুমার নামাজের আগেই ২ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে পড়ান স্থানীয় কাজী। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ছোট পরিসরে উৎসবমুখর পরিবেশে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়।
রাবেয়ার বড়চাচা আহসান হাবিব খোকন জানান, লিমনের একটি পা নেই। সেই ঘটনা তারা জানেন। কিন্তু তার যোগ্যতা দেখে জেনেশুনেই লিমনের সাথে তারা মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন।  
বর লিমন হোসেন জানান, বাবা-মায়ের পছন্দ করা মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছেন। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন। জুমার নামাজের পূর্বে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি জানান।
বিয়ের অনুষ্ঠানে লিমন হোসেন আরও জানান, বৃহস্পতিবার নিজ বাড়িতে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান হয়েছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লিমন বলেন, আমার এ পর্যন্ত আসার পেছনে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বাংলাদেশের সকল গণমাধ্যমকর্মী ও মাধবাধিকার কমিশনের অবদান কখনো ভুলতে পারব না। এছাড়া ঝালকাঠির সাংবাদিকদের কথাও ভোলা যাবে না। আমার বিয়েতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আসতে চাইলেও অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি। তার কাছে দোয়া চেয়েছি। বাবা-মাকে সবসময় সাহস দিতাম, আমাদের সুদিন আসবে, আমরা ঘুরে দাঁড়াবো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ার জন্যই আইন বিষয়ে পড়েছেন বলে জানান লিমন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার শারিরীক প্রতিবন্ধকতার কথা জেনেও আমার স্ত্রী রাবেয়া বসরী আমাকে মনে প্রাণে মেনে নিয়েছে।
কনে রাবেয়া বসরী জানান, লিমন একজন সংগ্রামী মানুষ। জীবনযুদ্ধে সে জয়ী হয়েছে। সংগ্রাম করে নিজের ক্যারিয়ার গড়ছে। আশা করি দাম্পত্য জীবনে তিনি আরো দায়িত্বশীল হবেন। আমি সবকিছু বুঝেই বিয়ে করেছি। লিমন-রাবেয়া দম্পতি এ সময় দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।
কনে রাবেয়া বসরীর বাবা জাহিদুল ইসলাম টিটো জানান, আনুমানিক ৬ মাস আগে ড. ফুয়াদ হোসেনের মাধ্যমে লিমনের সঙ্গে রাবেয়ার বিয়ের কথাবার্তা শুরু হয়। ছেলে-মেয়ে উভয়ের মতামতের ভিত্তিতে বিয়ে হয়েছে। মেয়ে ও জামাইয়ের জন্য সকলের নিকট দোয়া কামনা করেছেন তিনি।
ঢাকা গণবিশ্বাবিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের প্রধান ড. ফুয়াদ হোসেন জানান, কনে রাবেয়া বসরী সম্পর্কে আমার ভাতিজি হয়। একই কর্মস্থলে থাকার কারণে লিমনের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরই সূত্রধরে গত ৬ মাস ধরে উভয় পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ শুরু করা হয়। আজ শুক্রবার সেই যোগাযোগের অবসান বিবাহবন্ধনের মধ্যদিয়ে শেষ হয়েছে। বর-কনে উভয়ের সম্মতিতে দুই লাখ এক টাকা দেনমোহরে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
লিমনের বাবা তোফাজ্জেল হোসেন জানান, আমার ছেলেকে তো মেরেই ফেলেছিল। আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে। ওদের দুইজনের জন্য আপনারা সকলে দোয়া করবেন।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকালে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া ইউনিয়নে নিজ বাড়ির পাশের একটি বাগানে নিয়ে লিমনের পায়ের গুলি করেন র‌্যাব সদস্যরা। এরপর লিমনসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও অস্ত্র রাখার অভিযোগে দুটি মামলা করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন লিমনকে বাঁচাতে তার গুলিবিদ্ধ পা কেটে ফেলে চিকিৎসকরা। এরপর লিমনের মা বাদি হয়ে র‌্যাবের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন ঝালকাঠি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছিল, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকালে মায়ের সঙ্গে মাঠে গরু আনতে গিয়েছিলেন লিমন হোসেন। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়জন র‌্যাব সদস্য সেখানে উপস্থিত হন। লুৎফর রহমান নামে এক র‌্যাব সদস্য লিমনের শার্টের কলার ধরে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সন্ত্রাসী আখ্যা দেন। লিমন তখন র‌্যাব সদস্যদের বলেছিল সে সন্ত্রাসী নয়, একজন ছাত্র। এরপর র‌্যাব সদস্য লুৎফর রহমান মাথায় গুলি না করে লিমনের পায়ে গুলি করেন।
মামলা চলাকালিন সময় কারাগার হাসপাতালে থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যান লিমন। জামিনে বেরিয়ে ২০১৩ সালে পিরোজপুরের কাউখালী কাঠালিয়া পিজিএস বহুমুখী স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ২০১৮ সালে ঢাকা সাভারে গণবিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষা সহকারী পদে যোগদান করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আইন বিভাগের সহকারী প্রভাষক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন অদম্য লিমন হোসেন।



আরও খবর