স্পন্দন ডেস্ক: দেশের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক পরিস্থিতি বিদেশ নেওয়ার অবস্থায় নেই বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেছেন, “শারীরিক অবস্থা আল্লাহর অশেষ রহমতে যদি ‘স্টেবল (স্থিতিশীল) হয়, তখন চিন্তা করে দেখা হবে যে তাকে বিদেশে নেওয়া হবে সম্ভব হবে কিনা।”
শনিবার বিকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সবশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন তিনি।
ফখরুল বলেন, “দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তিনি বেশ কয়েকদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় এভার কেয়ার হাসপাতালে আছেন, তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা সংকটাপন্ন। দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসকবৃন্দ, আমেরিকার জন হপকিন্স এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশিষ্ট চিকিৎসকেরা তার চিকিৎসা করছেন।
“শুক্রবার রাতে তারা একটা মেডিকেল বোর্ড সভা করেছেন দুই ঘণ্টা, আড়াই ঘণ্টা ধরে। সেখানে তারা সমস্ত চিকিৎসকের মতামত নিয়ে কথা বলেছেন এবং কীভাবে তারা চিকিৎসা করবেন এবং সেই চিকিৎসা কী ধরনের হবে, সে বিষয়ে তারা কালকে মতামত দিয়েছেন নিজেদের মেডিকেল বোর্ডে।”
তিনি বলেন, “খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন, এ কথা তারা (চিকিৎসকেরা) বলছেন যে হয়ত প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু তার এখন যে শারীরিক অবস্থাৃতাকে বিদেশে নেওয়ার মত কোনো শারীরিক অবস্থা নেই।
“তবে বিদেশে নেওয়ার জন্য যে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো রয়েছে- ভিসা, অন্যান্য দেশের সঙ্গে...যেসব দেশে যাওয়া সম্ভব হতে পারে, সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যাপারগুলো নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে কাজ এগিয়ে আছে। অর্থাৎ যদি প্রয়োজন হয় এবং দেখা যায় যে ‘সি ইজ রেডি টু ফ্লাই’, তখন তাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।”
এর আগে শনিবার দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনও খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেওয়ার জন্য সব বন্দোবস্তের কথা তুলে ধরেন।
নিজের ফেইসবুক পেইজে তিনি লেখেন, “আমরা যতটুকু শুনেছি, দেশবাসীর দোয়া ও ভালোবাসায় সিক্ত আপসহীন নেত্রীর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে, তাকে লন্ডনে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরিকল্পনা করছে জিয়া পরিবার। এই বছরেই লন্ডনের যে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের অধীনে চার মাস থেকে তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, তাদের সঙ্গে ইতিমধ্যে যোগাযোগ করেছেন তারেক রহমান ও তার স্ত্রী। সেই লক্ষ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।”
হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ
বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা ‘অত্যন্ত সংকটময়’বলে শুক্রবার জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকার এভার কেয়ার হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত হাসপাতালটিতে ভিড় করছেন নেতাকর্মীরা। তবে নেতাকর্মীদের সেখানে ভিড় না করার অনুরোধ জানিয়েছেন দলের মহাসচিব।
সংবাদ সম্মেলনে ফখরুল বলেন, “আমি আপনাদের (সাংবাদিকদের) মাধ্যমে গোটা দেশবাসীর কাছে জানাতে চাই যে, স্বাভাবিকভাবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী এবং তার অসুস্থতায় সব মানুষই উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত এবং অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে ভিড় করছেন। এতে করে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকরা অত্যন্ত বিব্রত বোধ করছেন। তারা চিকিৎসাকার্য চালাতে ম্যাডামেরটাও এবং একসঙ্গে অন্যান্য যারা রোগী আছেনৃসেখানে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে।
“সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে অনুরোধ জানাতে চাই যে, আপনারা কেউ দয়া করে হাসপাতালে ভিড় করবেন না। অনুগ্রহ করে বিএনপি নেতাকর্মী, তার শুভাকাঙ্ক্ষী বা দেশের মানুষ তারা দয়া করে হাসপাতালে ভিড় করবেন না। সময়মত তার হেলথ বুলেটিন সম্পর্কে জানানো হবে, সেটা আপনারা জানবেন। কিন্তু আবার অনুরোধ করছি, দয়া করে কেউ সেখানে উপস্থিত হবেন না।”
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ‘মশাল রোড শো’ কর্মসূচি ঘোষণা করতে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। সেখানে বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক সবশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে দলের মহাসচিব।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের সাধারণ সম্পাদক একে এম কামরুজ্জামান নান্নু এবং বিজয়ের রোড শো কর্মসূচি উদযাপন কমিটির সদস্য জুবায়ের বাবু উপস্থিত ছিলেন।
৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘ দিন থেকে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।
রোরবার ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাকে ঢাকার বসুন্ধরার এভার কেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষা নিরীক্ষায় বুকে ‘সংক্রমণ’ ধরা পড়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “গত কয়েক মাস ধরেই উনি (খালেদা জিয়া) খুব ঘন ঘন আক্রান্ত হচ্ছিলেন। আমরা যে কারণে (এভারকেয়ার হাসপাতালে) ভর্তি করিয়েছি সেটা হচ্ছে যে, উনার কতগুলো সমস্যা একসঙ্গে দেখা দিয়েছে। সেটা হচ্ছে, উনার বুকে সংক্রমণ হয়েছে।
“যেহেতু উনার হার্টের সমস্যা আগে থেকেই ছিল। উনার হার্টে স্থায়ী পেসমেকার আছে এবং হার্টে ওনার স্ট্যান্টিং (রিং পড়ানো) করা হয়েছিল, রিং পড়ানো হয়েছিল। হার্ট ও ফুসফুস দুটোই একসঙ্গে আক্রান্ত হওয়াতে উনার খুব শ্বাস প্রশ্বাসজনিত সমস্যা হচ্ছিল। সেজন্য এখানে (এভারকেয়ার হাসপাতালে) আমরা খুব দ্রুত উনাকে নিয়ে এসেছি।”
সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুস্থতা কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল দোয়া মাহফিল করেছে। শনিবার আসরের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।