ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ বুধবার, ২৭ অক্টোবর , ২০২১ ● ১২ কার্তিক ১৪২৮

শরণখোলায় পানির জন্য ছোটাছুটি মানুষের!

Published : Wednesday 21-April-2021 21:01:13 pm
এখন সময়: বুধবার, ২৭ অক্টোবর , ২০২১ ২১:৫৮:০৪ pm

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি : বিধবা ফরিদা বেগম (৪৫) উপজেলার উত্তর রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা মৃত. আ. ছাত্তার হাওলাদারের স্ত্রী। মানুষের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করে দিন চলে তার। দিন শেষে কিছু খাবার যোগাড় করতে পারলেও পবিত্র রমজান মাসে প্রচণ্ড খরতাপের কারণে পানি সংকট যেন এখন তার কাজে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি অন্যের বাড়ির কাজ ফেলে রেখে এক কলসী পানি নিতে (বুধবার) দুপুরে পার্শ্ববর্তী গ্রামের গাজী বাড়ির সরকারি পুকুরে আসেন। সেখানে বিভিন্ন এলাকার অন্য লোকজনের ব্যাপক ভীড় থাকায় প্রায় ঘন্টা ব্যাপী লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। কোনো উপায় নেই, কারণ রোজা খুলতে হলে তো প্রথম পানির দরকার কিন্তু পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় বাড়ির মালিক পানি দিতে চান না। যার কারণে ফরিদার মতো উপজেলার বহু নারী-পুরুষ পানি সংগ্রহ করতে শুস্কমৌসুমে এখন দিক-বিদিক ছুটাছুটি শুরু করেছেন।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, শরণখোলা উপজেলা জুড়ে পানির জন্য হাহাকার চলছে। নদীর পানি লবনাক্ত, গভীর নলকূপ গুলোও অকেজো। অনাবৃষ্টি, সরকারি পুকুর খননে অনিয়ম, ঘুর্ণিঝড় সিড়র পরবর্তী এনজিও ভিত্তিক পানির প্রকল্প লোক দেখানো, এলাকা ভিত্তিক বাজার জাতকরা বিশুদ্ধ পানির গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ, দীর্ঘদিন ধরে পুকুর ও খাল খনন না করা, সরকারি পুকুর, খাল-বিল ও জলাশয় দখল হওয়াসহ নানা কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পুকুরের পানি শুকিয়ে গিয়ে এখন তলানিতে ঠেকেছে। তাই বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা দূষিত পানি পান করায় ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগসহ নানা রকমের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী  মো. মেহেদী হাসান বলেন, শুস্কমৌসুমে নলকূপের পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) ও রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং-এর উপর নির্ভর করতে হয় এ অঞ্চলের মানুষদের। উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ১১ শতাধিক পিএসএফ থাকলেও তার অধিকাংশ অকেজো। এছাড়া পুকুরের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় অন্য পিএসএফ গুলোও ব্যবহারে অনুপোযোগী হয়ে পড়ছে। যার কারণে চরম পানি সংকট চলছে। তবে, আমরা ভ্রাম্যমাণ মোবাইল ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে সাময়িক ভাবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিনা-মূল্যে খাবার পানি সরবারহ কার্যক্রম শুরু করেছি। শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফরিদা ইয়াছমিন জানান, ডায়রিয়ায়সহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০এপ্রিল ২১জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে গত ১ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ স্বাস্থ্য-কমপ্লেক্সে ভর্তি হলেও আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। উপজেলার উত্তর রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা খলিল গাজী , শাহজাহান শিকারী, জাকির গাজীসহ অনেকে বলেন, রৌদ্রের ব্যাপক তাপে তাদের এলাকার খাল-বিল, পুকুর সব শুকিয়ে গেছে। ৪/৫ মাইল পথ পায়ে হেটে গিয়েও অনেকে পানি পাচ্ছেন না। প্রায় পাঁচ মাস ধরে বৃষ্টির দেখা নেই। মানুষ এখন পানির জন্য ছুটাছুটি  করছে। পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান তারা।

৩ নম্বর রায়েন্দা ইউনিয়নের ১ নম্বর উত্তর রাজাপুর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জাকির হোসেন খান বলেন, তার ওয়ার্ডের  অধিকাংশ পুকুর- খাল ও জলাশয় এখন পানি শুন্য। সাধারণ মানুষ ৩/৪ মাইল পথ হেটে পানি আনেন  কিন্তু তাও  জীবানু মুক্ত নয়। ওই সব দূষিত পানি পান করে অনেকে ইতোমধ্যে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।

তবে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ৩৫/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধ নির্মাণে ধীরগতি, জেলা পরিষদের  তত্বাবধানে সরকারি পুকুর খননে অনিয়ম, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে টিওবয়েলসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি-বেসরকারি ভাবে স্থাপিত (পিএসএফ) গুলো অকেজো এবং খাল-বিল ও জলাশয় দখলের প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বছর শুস্কু-মৌসুম এলে পানির জন্য এ অঞ্চলে হাহার দেখা দেয়। কিন্তু তাতেও ঘুম ভাঙেনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। এছাড়া সিড়র পরবর্তী সময়ে গত এক যুগে বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে শরণখোলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত পানির প্রকল্প গুলো ছিলো অনেকটাই লোক দেখানো ও নি¤œ মানের বলে তিনি দাবি করেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহিন জানান, উপজেলার সর্বত্র পানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।



সর্বশেষ সংবাদ
আরও খবর