ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ সোমবার, ২৫ অক্টোবর , ২০২১ ● ৯ কার্তিক ১৪২৮

জলে বসবাস ৪০ বছর

Published : Wednesday 06-October-2021 21:46:26 pm
এখন সময়: সোমবার, ২৫ অক্টোবর , ২০২১ ০৩:১৬:৩৩ am

# যশোরের দুঃখ ভবদহ

আবদুল কাদের ও আব্দুল মতিন: যশোরের দুঃখ ভবদহ। গত ৪০ বছর ধরে এখানকার বাসিন্দারা পানির সাথে বসবাস করছেন। সরকার প্রকল্প নেয়, কিন্তু ভবদহ অঞ্চলের মানুষের অভিশাপ ঘোচে না। বর্তমানে অভয়নগর ও মণিরামপুর উপজেলার ৮০টি গ্রামে পানি ঢুকেছে। বৃষ্টির পানিতে এসব গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িঘর, শিক্ষা এবং ধর্মীয়  প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে।

পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন ভবদহ অঞ্চলের পানিবন্দি প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। অনেক পরিবার ঘরের মধ্যে মাঁচা করে সেখানে থাকছেন। শৌচাগার এবং নলকূপ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশন এবং পানীয়জলের সংকট দেখা দিয়েছে।

যশোর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সদস্যরা সম্প্রতি ভবদহ অঞ্চল ঘুরে এসেছেন। সংগঠনটির নেতা অধ্যাপক সুকুমার দাস জানান, ভবদহ অঞ্চলের মানুষের কষ্ট চোখে দেখা যায় না। বছরের পর বছর ধরে তারা পানির সাথে বসবাস করছেন। সরকার প্রকল্প নিচ্ছে কিন্তু মানুষ সুফল পাচ্ছে না। সুফল ভোগ করছেন সুবিধাবাদীরা। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এসে ভবদহ অঞ্চল ঘুরে দেখার আহবান জানান।

যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ভবদহ অঞ্চল। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী দিয়ে এলাকার পানি ওঠা-নামা করে। অভয়নগর উপজেল ভবানীপুর গ্রামে শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে মূলত এলাকার ৫২টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয়। পলি পড়ে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। এই অবস্থায় বৃষ্টির পানিতে এলাকার বিলগুলো প্লাবিত হয়েছে। বিল উপচিয়ে পানি ঢুকেছে বিলসংলগ্ন গ্রামগুলোতে।

ভবদহ অঞ্চলে যখন এই অবস্থা তখন এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে বৈদ্যুতিক সেচ যন্ত্র দিয়ে পানি সেচের কাজ চলছে। ভবদহ ২১ ভেন্ট (কপাট) স্লুইসগেটের ওপর ১৪টি এবং ৯ ভেন্ট  স্লুইসগেটের ওপর ৬টি বৈদ্যুতিক সেচযন্ত্র বসানো আছে। স্লুইসগেটের একপাশের নদী থেকে পানি সেচে পাইপের মাধ্যমে অপর পাশে নদীতে ফেলা হচ্ছে। ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্ক্যাভেটর দিয়ে ২১ ভেন্ট স্লুইসগেটের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে ৩ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার শ্রী ও টেকা নদীতে পাইলট চ্যানেল কাটার কাজ চলছে।

অভয়নগর উপজেলার বলারাবাদ, বেদভিটা, ডুমুরতলা, আন্ধা, বারান্দী, দিঘলিয়া, কোটা, চলিশিয়া, ডহর মশিয়াহাটী, রাজাপুর, রামসরা, সুন্দলী, ভাটবিলা, সড়াডাঙা, গোবিন্দপুর, হরিশপুর, ফুলেরগাতী, দামুখালী, দত্তগাতী, জিয়াডাঙ্গা এবং মনিরামপুর উপজেলার হাটগাছা, সুজাতপুর, কুলটিয়া, লখাইডাঙ্গা, মহিষদিয়া, আলীপুর, পোড়াডাঙা, পদ্মনাথপুর, পাড়িয়ালী, দহাকুলা, কুচলিয়া, নেবুগাতী, পাঁচকাটিয়া, ভুলবাড়িয়া, কুমারসীমা, কপালিয়া, বালিদহ, পাচাকড়িসহ আরও কয়েকটি গ্রামের কোথাও আংশিক আবার কোথাও বেশিরভাগ বাড়িতে পানি উঠেছে। এসব গ্রামের অনেক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

ভবদহ অঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, ইতিমধ্যে গ্রামগুলোর শত শত বাড়িতে পানি উঠেছে। অনেক শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও পানির নিচে চলে গেছে। রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় এলাকার অনেক জায়গায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। বৃষ্টি থেমে গেলেও প্রতিদিন এক-দুই ইঞ্চি করে পানি বাড়ছে। ঘরের মধ্যে পানি ঢুকে পড়ায় মাঁচা করে সেখানে তারা থাকছেন।

অভয়নগর উপজেলার ডহর মশিয়াহাটি গ্রামের শুভ মন্ডল জানান, আমার ঘরের মধ্যে পানি। বাঁশের খুঁটির ওপর তক্তা বসিয়ে উঁচু করে সেখানে থাকছেন তিনি। ঘরের এক পাশে তিনটি ছাগল ও চারটি মুরগি থাকে। ঘরের অপর পাশে তিনি রান্না করেন। একই গ্রামের জ্যোতিন্দ্রনাথ মন্ডল বলেন, সব জায়গায় জল। প্রতিদিন দুই আঙুল করে জল বাড়ছে। ঘরে জল ছুঁই ছুঁই করছে। বাড়িতে থাকা যাচ্ছে না। টিউবওয়েলে ঠিকমতো জল উঠছে না। বাথরুম তলিয়ে থাকায় খুব কষ্ট হচ্ছে।’ ডুমুরতলা গ্রামের শংকর বিশ্বাস বলেন, গ্রামে ১৪৮টি বাড়ি আছে। এরমধ্যে ১৩৫ থেকে ১৩৮ বাড়িতে জল উঠে গেছে। ঘরের মধ্যে ইট দিয়ে খাট উঁচু করে সেখানেই সবাই থাকছে।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক রনজিত বাওয়ালী জানিয়েছেন, ভবদহের সমস্যার কারণে ওই অঞ্চলের ৮০টি গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তিনি জানান, তার নিজ গ্রাম ডুমুরতলা গ্রামের ১৪৮টি পরিবার স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তাদের দায়ী করে বলেন, মানুষকে জিম্মি করে তারা ভবদহের সমস্যা সমাধানের নামে বড় বড় প্রকল্প তৈরী করে লুটপাট করে চলেছেন। যে কারণে যুগের পর যুগ ভবদহ পাড়ের মানুষের চোখের পানি পড়লেও ভবদহের মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ইতিমধ্যে সেচ প্রকল্পের নামে প্রকল্প তৈরী করে পানি অপসারণের কাজ চালিয়েছেন। বিলকপালিয়ায় টিআরএম বাস্তবায়ন ছাড়া পানি থেকে বাঁচা যাবে না।

মণিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আবুল হাসান জানিয়েছেন, ভবদহ সমস্যার কারণে মণিরামপুরের বিলকপালিয়া, কুমারঘাটা, বিল বোকড়, কড়ামারা এবং হরিনা বিলের এ বছর ৩ হাজার বিঘা আবাদযোগ্য জমিতে কোনো ফসল করতে পারেননি চাষিরা। ফলে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে ঘের ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি অতি বৃষ্টিপাত এবং ভবদহ সমস্যার কারণে ¯্রােত না থাকায় বিল নদীর একাকার হয়ে পড়েছে। ফলে বিলে মৎস্য চাষি ঘের মালিকরা চরম পরিস্থিতি অতিক্রম করছেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কুমার ঘোষ।

মণিরামপুর উপজেলার হাটগাছা গ্রামের তাপসী বৈরাগী বলেন, বালু কিনে উঠোন উঁচু করেছি। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। উঠোনে জল উঠেছে। জল বাড়ছে। জল ঘরে উঠার উপক্রম হয়েছে। খুব কষ্টে আছি। সুজাতপুর গ্রামের শিব মন্ডল বলেন, উঠোনে দেড় হাত জল। বাথরুমে জল। গোয়ালে জল। খুব কষ্ট করে থাকছি। জল যেভাবে বাড়ছে তাতে বেশিদিন ঘরে থাকা যাবে না।

অভয়নগর উপজেলার ডহর মশিয়াহাটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রভাত কুমার রায় বলেন, শ্রেণিকক্ষের মধ্যে ছয় ইঞ্চি জল। ক্লাস করতে খুব অসুবিধা হচ্ছে। অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিকাশ রায় বলেন, ‘সুন্দলী ইউনিয়নে ১৪টি গ্রামের সব কয়টি প্লাবিত। এরমধ্যে দুটি গ্রামে আংশিক এবং ১২টি গ্রামের অধিকাংশ বাড়িঘরে জল উঠেছে। বেশিরভাগ বাড়ির শৌচাগার ও নলকূপ জলে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষ ভীষণ ভোগান্তিতে পড়েছেন।

উপজেলার চলিশিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাদির হোসেন মোল্যা বলেন, ইউনিয়নের চারটি গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতে এবং দুটি গ্রামে বেশ কিছু বাড়িতে পানি উঠেছে। ওই চারটি গ্রামের অবস্থা খুব খারাপ।’

মণিরামপুর উপজেলার হরিদাশকাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিপদ ভঞ্জন পাঁড়ে বলেন,‘আমার ইউনিয়নে ২২টি গ্রামের মধ্যে আটটিতে জল প্রবেশ করেছে। এরমধ্যে পাঁচটি গ্রামের অনেক বাড়িঘর এবং কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মন্দির জলে তলিয়ে গেছে।

ভবদহ সংলগ্ন মনোহরপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাষ্টার মশিয়ুর রহমান, জানিয়েছেন, সম্প্রতি অতি বৃষ্টিপাতসহ ভবদহ সমস্যার কারণে এলাকার জনসাধারণ চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এ সকল পরিস্থিতির জন্য এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তাদের দায়ী করছেন।  তবে এসব অভিযোগকে অস্বীকার করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহিদুল ইসলাম জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড বরাবরই চেষ্টা করছেন ভবদহের সমস্যার সমাধানের জন্য। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করতে চলেছেন। ভবদহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নামে যে সব সংগঠন করা হয়েছে তার এক শ্রেণীর নেতারা এটাকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন।