ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর , ২০২১ ● ২ আশ্বিন ১৪২৮

করোনায় পানির দরে ফুল

Published : Sunday 01-August-2021 21:33:59 pm
এখন সময়: শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর , ২০২১ ১২:১৯:২৬ pm

আব্দুল কাদের/জামির হোসেন (কালীগঞ্জ): করোনার প্রভাব পড়েছে যশোরের গদখালী ও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ফুলের। কঠোর লকডাউনে সাধারণ মানুষ জনজীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথম করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এ বছর ফুলচাষিরা ফুল উৎপাদন করেছেন বেশি। কিন্তু  ফুল বিক্রি হচ্ছে না কোথাও। ফলে গদখালী ও কালীগঞ্জের ফুল চাষিদের ফুল বিক্রি না হওয়ায় জায়গা পরিষ্কার করার জন্য পানির দরে বিক্রি করছে।

ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের গদখালী গ্রামের ফুলচাষি সুমন বিশ^াস। দুই বিঘা জমিতে গোলাপ আর দুই বিঘা জমিতে জারবেরা চাষ করেছিলেন। প্রতি মাসে গড়ে ৭০ থেকে লক্ষাধিক টাকার ফুল বিক্রি করতেন তিনি। গত বছর করোনার প্রকোপের সময় মোটেও ফুল বিক্রি করতে পারেননি তিনি। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে তার দুই বিঘা জমির জারবেরা পলিশেড উড়ে যায়। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে শেডটি মেরামত করেন। গত বছর আগস্ট থেকে ঘুরে দাঁড়ায় ফুলের বাজার। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন সুমন। সেই স্বপ্ন আবার ভেঙে চুরমার করেছে তার করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে। ফুল বিক্রিতে বিপর্যয় চলছে তার। করোনা ও লাগাতার লকডাউন-বিধিনিষেধে ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে জমিতে ফোটা ফুল। স্থানীয় বাজারে ফুলের বেঁচাকেনা ও চাহিদা না থাকায় বাধ্য হয়ে; গ্রাম থেকে ৩৫ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে যশোর শহরে পানির দরে ফেরি করে ফুল বিক্রি করছেন তিনি। শুধু সুমন বিশ^াস নয়; গদখালী এলাকার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ফুলচাষি জমি থেকে ফুল কেটে শহর কিংবা গ্রামে সাইকেল বা ভ্যানে ফেরি করে ফুল বিক্রি করছেন। আবার অনেকেই সেটা না করতে পারায় ক্ষেতের ফুল কেটে গরু-ছাগলের খাদ্য হিসাবে জোগান দিচ্ছেন। 

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি সূত্র মতে, যশোরের ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার ৭৫টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করা হয় হরেক রকমের ফুল। ঝিকরগাছার পানিসারা-গদখালী গ্রামগুলোর রাস্তার দুইপাশে দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে সারাবছরই লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা রঙের ফুলের সমাহার হয়ে থাকে। শত শত হেক্টর জমি নিয়ে গাঁদা, গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জারবেরা, কসমস, ডেইজ জিপসি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ হয় এখানে। এলাকায় উৎপাদিত ফুল বিক্রির জন্য গদখালীতে যশোর রোডের দুই ধারে রয়েছে ফুলের বাজার। প্রতিদিন উপজেলার গদখালী-পানিসারার শত শত ফুলচাষির আনাগোনা শুরু হয় গদখালীর বাজারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছোট-বড় পাইকাররাও সেখান থেকে ফুল কিনে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন হাতবদল হয়ে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ফুল ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে, এমনকি দেশের বাইরেও। তবে করোনার কারণে এই কার্যক্রমে ছেদ পড়েছে গদখালী-ব্যবসায়ীসহ এই সেক্টরের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর ৩০০ কোটি টাকার ফুল উৎপাদন হয় এসব মাঠ থেকে। 

যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ^াস বলেন, উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৬২৫ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফুলের চাষ হচ্ছে। ফুল চাষের সঙ্গে এখানকার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কৃষক এবং প্রায় এক লাখ শ্রমিক সম্পৃক্ত রয়েছেন। করোনার কারণে ফুলের বাজার বন্ধ রয়েছে। খেতে ফুল নষ্ট হচ্ছে। ফুলচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা হিসাবে আউশ ধানের বীজ, টমেটোর চারা দিয়েছি।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, দেশের চাহিদার শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ফুল যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। করোনার কারণে গত বছর ৫ মাস এবং এ বছরের ৩ মাসে ফুল বিক্রির সুযোগ না থাকায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফুল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে শুধু যশোর অঞ্চলে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩০০ জন চাষিকে ২ কোটি টাকার মতো ঋণ দেয়া হয়েছে। করোনার কারণে চাষিদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন শেষ। ফুলচাষিদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। উৎপাদন ধরে রাখতে চাষিরা ক্ষেতের ফুল গরু-ছাগলকে খাওয়াচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক অনুষ্ঠানের অনুমতি ও একই সঙ্গে ফুলচাষিদের প্রণোদনা বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান কৃষক এই নেতা।

অপরদিকে দুই বিঘা জমিতে গাঁদা আর এক বিঘা জমিতে লাল গোলাপ ফুলের চাষ করেছেন কালীগঞ্জের কৃষক রাজু। প্রায় অর্ধ-লক্ষাধিক টাকা খরচ করে চাষ করা ক্ষেতে সবে মাত্র ফুল উঠা শুরু করেছে। সপ্তাহে গড় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার ফুল বিক্রিও করছিলেন। কিন্তু করোনাকালী লকডাউনে সব বন্ধ হয়ে গেছে। ফুলচাষি রাজু ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না গ্রামের পূর্বপাড়ার মিয়া বাড়ির ছেলে।

ফুলচাষি রাজুর ভাষ্য, করোনার আগে দেশীয় জাতের গোলাপ দুই থেকে তিন টাকা এবং থাই জাতের গোলাপ পাঁচ থেকে সাত টাকায় বিক্রি করতেন। কিন্তু করোনার কারনে লকডাউনের ফলে সে ফুল ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া এক বান্ডিল গোলাপ লকডাউনের আগে ঢাকা বা চট্রগ্রামে পাঠাতে ৩০০ টাকা খরচ হত সেখানে এখন প্রায় এক হাজার টাকা খরচ পড়ছে। ফলে বাধ্য হয়ে ফুল বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। যে কারণে গাছের গোলাপ শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছে।

এ বছর ঝিনাইদহের ছয় উপজেলায় ১৭৩ হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়। এরমধ্যে গাঁদা ১১৩ ও রজনী ২৪ হেক্টর বাকি জমিতে অন্যান্য ফুলের চাষ হয়েছে। গেল বছর এ জেলায় চাষ হয়েছিল ২৪৫ হেক্টর। প্রতিবছর সব থেকে বেশি ফুলের চাষ হয় জেলা সদর উপজেলার গান্না ও কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে।

গেল ২০২০ সালের মার্চে দেশের করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ার পর দেশে অঘোষিত লকডাউন শুরু হয়। ফলে ফুল বিক্রিতে ধস নামায় জেলার ফুলচাষিদের ব্যপক লোকসান হয়েছিল। ফুল বিক্রি করতে না পারায় ফুলক্ষেত গরু ছাগল দিয়ে খাওয়ে দিয়েছিল। করোনার প্রভাব কিছুটা কমে আসার পর আবারো চাষিরা নতুন করে ফুলের চাষ শুরু করে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠার স্বপ্ন নিয়ে সবেমাত্র ফুল বিক্রি শুরু করেছিল। কিন্তু এবারো করোনার কারণে সরকার লকডাউন ঘোষণা করায় সে স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।



আরও খবর